কভিড-১৯ মহামারীর ফলে অর্থনৈতিক বৈষম্য, অনগ্রসর সম্প্রদায়, অসমতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো ঘিরে উদ্বেগ জোরদার হওয়ার পাশাপাশি শুধু সাশ্রয়ী মূল্যে ভালো মানের পণ্য সরবরাহ করা নয়, আরো বেশি আবদান রাখার জন্য করপোরেশনগুলোর ওপর ক্রমশ চাপ বাড়ছে। জনসাধারণের পরিবর্তিত মেজাজের প্রতি সাড়া দিয়ে আমেরিকান অলাভজনক সংস্থা দ্য বিজনেস রাউন্ডটেবিল গত বছর ঘোষণা দেয়, ‘আমাদের প্রত্যেক স্টেকহোল্ডারই অপরিহার্য। আমাদের সংস্থা, সম্প্রদায় এবং দেশের ভবিষ্যৎ সাফল্যের জন্য আমরা তাদের প্রত্যেকের কাছে মূল্য সরবরাহে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
তবে বিষয়গুলো এভাবে তুলে ধরাটা কার্যকরী নয়। করপোরেশনের বর্ণিত উদ্দেশ্যগুলোর অবশ্যই এর সিদ্ধান্তগুলোকে পথ দেখাতে সাহায্য করা উচিত। প্রত্যেক স্টেকহোল্ডার যদি অপরিহার্য হয়, তাহলে কেউই নয়। সবাইকে খুশি করার প্রচেষ্টা চালাতে গিয়ে বিজনেস রাউন্ডটেবিল সম্ভবত কাউকেই আর সন্তুষ্ট করতে পারবে না। সাম্প্রতিক তথ্যপ্রমাণ অনুসারে আমরা দেখি, যে করপোরেশনগুলো দলগত ‘স্টেকহোল্ডার ক্যাপিটালিজম’ বিবরণীতে স্বাক্ষর করেছে, মহামারীর প্রতিক্রিয়ার তাদের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের চাকরিচ্যুত করার সম্ভাবনা বেশি ছিল এবং ত্রাণ প্রচেষ্টায়ও অনুদানের সম্ভাবনা ছিল অনেক কম।
তাহলে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মিলটন ফ্রিডম্যানের প্রস্তাবিত শেয়ারহোল্ডারকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি কি ভুল? ফ্রিডম্যানের যুক্তি ছিল, পরিচালকেরা যেহেতু শেয়ারহোল্ডার কর্তৃক নির্বাচিত হন, তাই তাদের দায়িত্ব হচ্ছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুনাফা এবং শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধি করা। পন্থাটি ৫০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের করপোরেট আধিকারিকদের দ্বারা ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়। তবে এর মূল যুক্তিটিকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি কর্মীদের ক্ষতি স্বীকার করে কোটিপতি বিনিয়োগকারীদের আনুকূল্য প্রদান করা উচিত—অনেক পর্যবেক্ষকের কাছে ধারণাটি রীতিমতো ভয়াবহ।
তবুও ফ্রিডম্যানের দৃষ্টিভঙ্গি ঘিরে আরো গভীর যুক্তি রয়েছে এই স্বীকৃতির ওপর ভিত্তি করে যে পরিচালকেরা অপরিহার্যভাবে শেয়ারহোল্ডারদের পক্ষে অন্য সবাইকে নিষ্পেষিত করবেন না। কেননা ডেবট হোল্ডারদের সুদ এবং শ্রমিকদের মজুরি প্রদানের পরে যা কিছু অবশিষ্ট থাকে শেয়ারহোল্ডাররা তা পান, তাই পরিচালকেরা যদি ‘রিশিডিউল ক্লেইম’ বা ‘অবশিষ্ট দাবি’র তুলনায় ব্যবসায়ের প্রভাব, ভাবমূর্তি ও কার্যক্রমের আকার প্রসারিত করেন তবেই অংশীদারদের অবশিষ্টাংশের দাবি সর্বাধিক করা সম্ভব। ব্যবসায়ের আকার প্রসারিত করতে শেয়ারহোল্ডারদের আগ্রহের দিকে নজর দেয়ার আগে ম্যানেজমেন্টকে অবশ্যই অন্য সবাইকে সন্তুষ্ট করতে হবে, যারা এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানে অবদান রাখে তাদের সর্বাধিক মূল্য দেয়।
এটা সত্যি কেউ কেউ বিরোধিতা করবেন যে তাহলে ত্রৈমাসিক মুনাফা বাড়াতে বাধ্যতামূলকভাবে শ্রমিক প্রশিক্ষণের মতো ক্ষেত্রে ব্যয় হ্রাস ঘটবে। তবে প্রতিষ্ঠান যদি দীর্ঘসময়ের জন্য তাদের শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধি করতে চায়, তাহলে প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেবে, যখন তাদের ব্যয় হ্রাস হবে তখন সরবরাহকারীদের টেকসই অনুশীলনকে উৎসাহিত করবে এবং গ্রাহকদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পরিবর্তে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তুলবে। অন্যভাবে প্রধান নির্বাহীরা মূলত শেয়ারের মূল্যের দিকে মনোনিবেশ করেন, তবে তার অর্থ এটা নয় যে শেয়ারবাজার কেবল এর ত্রৈমাসিক উপার্জনকে বাড়িয়ে তোলে এমন ক্রিয়াকলাপকে পুরস্কৃত করে। অ্যামাজন যেমন বছরের পর বছর ধরে খুব কম মুনাফা করেছে, কিন্তু এখন প্রতিষ্ঠানটি রীতিমতো সমৃদ্ধিশালী, একের পর এক লাভ করছে। তার কারণ এটি তার ব্যবসায়ে অনেক বেশি বিনিয়োগ করেছে।
ত্রৈমাসিক ফলাফলগুলোর শেয়ারমূল্য প্রভাবিত করার কারণ স্বল্পমেয়াদি মুনাফাকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিচ্ছবি হিসেবে। একইভাবে দীর্ঘমেয়াদি মুনাফালাভের প্রচেষ্টা ত্যাগ করে স্বল্পমেয়াদি মুনাফা বৃদ্ধির চেষ্টার পরিবর্তে করপোরেট ম্যানেজাররা বরং বিনিয়োগকারীদের সহনশীলতা বাড়াতে আরো ভালোভাবে বিনিয়োগ কৌশলগুলো ব্যাখা করতে পারেন। বাজার বিশ্লেষকেরা যদি তাদের যুক্তিটি গ্রহণ না করেন—সম্ভবত তাদের একটি বক্তব্য রয়েছে—তাহলে নতুন ব্যবস্থাপনা ক্রমযুক্ত হতে পারে। অর্থহীন স্বল্পকালীন ফলাফল চাপিয়ে দেয়ার পরিবর্তে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ শোভন করপোরেট বোর্ডগুলোর ওপর নির্ভর করে। তারা ব্যবস্থাপকদের দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণে উৎসাহিত করতে পারেন। শেয়ারহোল্ডারদের প্রয়োজন পূরণে কখনই অস্পষ্ট বিবৃতি প্রদান করা উচিত নয়।
এটা নিশ্চিত যে করপোরেট ব্যবস্থাপকেরা ক্রমবর্ধমান বেতনের ন্যায্যতা প্রমাণ করার জন্য শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গে তাদের আগ্রহগুলো ‘সমন্বিত’ বলে দাবি করে ফ্রিডম্যানের মূল সূত্রটির অপব্যবহার করেছেন। তবে এটি করপোরেট সুশাসনের ব্যর্থতাকে প্রতিফলিত করে; মৌলিক উদ্দেশ্যগুলোকে নয়। ফ্রিডম্যানের সূত্রের মূল সমস্যাটি হলো, প্রযুক্তিগতভাবে এটি যতই সঠিক হোক না কেন, ভুল বোঝাবুঝির ক্ষেত্রে এটি একটি পার্থক্য করে: আজকের আদর্শবাদী কর্মী ও গ্রাহক যা মানতে রাজি নন।
মনোভাব পরিবর্তনের কারণ হলো করপোরেশন কর্তৃক শুধু শেয়ারহোল্ডারদের মুনাফা বৃদ্ধির ঘোষিত প্রতিশ্রুতি মূল নির্বাচকমণ্ডলীকে সরিয়ে দেয়ার ঝুঁকিতে ফেলে, যা তাদের শেয়ারের দামে প্রতিকূলভাবে প্রতিফলিত হবে।
এ কারণেই ম্যাককিনসি অ্যান্ড কোম্পানির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, করপোরেশনগুলো আরো ‘উদ্দেশ্যচালিত’ হয়ে উঠেছে। তাদের দাবীকৃত সুবিধাগুলোর মধ্যে রয়েছে আয় বৃদ্ধিকে শক্তিশালীকরণ (সামাজিকভাবে সচেতন গ্রহকদের আর্কষণ করে), বৃহত্তর ব্যয় হ্রাস (যেমন পানি ও জ্বালানি দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে) এবং আরো দক্ষ কর্মী নিয়োগ এবং অনুপ্রেরণা দান (ভালো কাজ করে স্বীকৃতি প্রাপ্তি)।
এ লক্ষ্যগুলোর কোনোটিই অবশ্য শেয়ারহোল্ডারদের সর্বাধিক মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে দ্বন্দ্বাত্মক নয়। করপোরেট উদ্দেশ্যগুলো যতটা সম্ভব উপকারী, যতক্ষণ পর্যন্ত এটি কঠিন নির্বাচনক্ষেত্রগুলোকে প্ররোচিত করে। উদ্দেশ্য যদি সবাইকে সন্তুষ্ট করা হয়, তাহলে যে করেই হোক গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড প্রবর্তন করবে। ব্যবস্থাপকদের মূল বিষয়টি হলো যখন ব্যবসায়িক কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে তখন ভিন্ন ভিন্ন এলাকার মধ্য থেকে তারা কীভাবে বাছাই কার্যক্রম সম্পন্ন করবেন।
উদাহরণস্বরূপ গুগল যখন সামরিক উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি বিষয়ক মার্কিন সরকারের কর্মসূচি থেকে সরে আসে, তখন তাদের এ সিদ্ধান্ত ইঙ্গিত প্রদান করে যে বৃহত্তর ও লাভজনক ক্লায়েন্টের স্বার্থ রক্ষার চেয়ে তাদের কাছে তাদের কর্মীদের আপত্তির বিষয়টি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে গুগলের কর্মী ও গ্রাহকেরা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন যে প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে তাদের স্বার্থ রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং স্পষ্টতার বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানটির জন্য লাভজনক হবে, শেয়ারমূল্যসহ।
কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান বিষয়গুলোকে আরো বেশি মাত্রিকতা দিয়েছে, যেমন রাষ্ট্রীয় বিধিবিধানের অনুপস্থিতিতে তারা নিজেদের জন্য ও তাদের সরবরাহকারীদের জন্য টেকসই গাইডলাইন প্রস্তুত করেছে।
করপোরেট অভিজাতদের সম্মিলিত কাজ ঝামেলাপূর্ণ: বড় বড় প্রতিষ্ঠান সহজেই গাইডলাইন অনুসরণ করার সক্ষমতা ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজারে প্রবেশকে রুখে দিতে পারে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ক্রেতারা অন্য সরবরাহকারীদের দমন করতে ‘কার্টেল’ গঠন করতে পারে। সেই হিসেবে নিজেরা না করে করপোরেশনগুলো নির্বাচিত সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য চাপ দিলে আরো ভালো হয়।
পরিশেষে বলতে চাই, করপোরেটদের রাজনৈতিক প্রভাব ও বক্তব্যগুলো নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। আমেরিকার কয়েকটি রাজ্যে এলজিটিবিকিউ অধিকার বিষয়ক বিধিনিষেধ সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে ঘিরে অনেক স্টেকহোল্ডারই চাচ্ছেন যে তাদের কোম্পানিগুলো এখানে জোরালো অবদান রাখুক। এরাই হচ্ছে ওই স্টেকহোল্ডার যারা কোনোভাবেই চান না যে করপোরেট অর্থ নির্বাচনকে প্রভাবিত করুক। তাই এখানে তারা আপত্তি করছেন।
সাধারণভাবে বলতে গেলে কোনো সংস্থার ব্যবসায়িক স্বার্থের বাইরে হস্তক্ষেপের বৈধতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন উত্থাপিত হয়: কার মতামতের প্রতিনিধিত্ব করা হচ্ছে? ব্যবস্থাপনক? তবে পরিচালকেরা কিন্তু তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য নয়, কোম্পানি পরিচালনার দক্ষতার জন্য নিয়োগ পেয়েছিলেন। স্টেকহোল্ডাররা? কেন এবং কিসের ভিত্তিতে?
করপোরেশনগুলোকে এখানে সতর্ক থাকতে হবে। যদিও সরকারি পদক্ষেপগুলোকে পুরস্কৃৃত বা দণ্ডিত করার জন্য আমাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া রয়েছে এবং পরিচালকদের জবাবদিহি করার জন্য রয়েছে করপোরেট প্রক্রিয়া। তবে প্রথাগত সরকারি ভূমিকাকে স্বীকৃতি দেয় এমন ব্যবসায়গুলোকে চিহ্নিত ও তদারকির জন্য আমাদের শক্তিশালী মেকানিজমের অনুপস্থিতি বিদ্যমান। যতক্ষণ না আমরা এটা করতে পারব, ততক্ষণ পর্যন্ত জনসাধারণের কাছে দায়বদ্ধ করপোরেশনগুলোই জনগণের গ্রহণযোগ্যতার সীমা অতিক্রমের ঝুঁকি নেবে। তাই ঘুমন্ত কুকুরকে জাগিয়ে না দেয়াটাই ভালো।
[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]
রঘুরাম রাজন: রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) সাবেক গভর্নর
শিকাগোর বুথ স্কুল অব বিজনেসের অধ্যাপক
ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস