ফ্রি ট্রেড জোনে আমদানির নীতিমালা প্রকাশ

দেশীয় ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রি হলে আমদানি-রফতানির আনুষ্ঠানিকতা বাধ্যতামূলক

দেশে প্রতিষ্ঠিত হতে যাওয়া ফ্রি ট্রেড জোন (এফটিজেড) চালুর আগেই সেখানে আমদানি ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জন্য সুস্পষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামো নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

নতুন নীতিমালায় কনসাইনমেন্ট ভিত্তিতে আমদানি করা পণ্যের মালিকানা, ব্যাংক অর্থায়ন, বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেন, ঋণের মেয়াদ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ (এফইপিডি-১) থেকে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনের কপি দেশের সব অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকের কাছে পাঠানো হয়েছে।

জারীকৃত নীতিমালা অনুযায়ী, কনসাইনমেন্ট ভিত্তিতে আমদানি করা পণ্যের মালিকানা বিদেশী সরবরাহকারীর কাছেই থাকবে। উৎপাদনে ব্যবহার বা চূড়ান্ত ক্রেতার কাছে বিক্রির আগে ওই পণ্যকে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের সম্পদ হিসেবে দেখানো যাবে না। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোও এসব পণ্যের বিপরীতে ঋণ এক্সপোজার গ্রহণ করতে পারবে না। এফটিজেড থেকে দেশের অভ্যন্তরে পণ্য বিক্রি হলে ক্রেতার জন্য তা আমদানি এবং বিক্রেতার জন্য রফতানি হিসেবে গণ্য হবে। এ-সংক্রান্ত সব লেনদেন বৈদেশিক মুদ্রায় নিষ্পত্তি করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এ নির্দেশনা এমন এক সময়ে এল, যখন সরকার বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং রফতানিমুখী শিল্প সম্প্রসারণে নতুন প্রজন্মের ফ্রি ট্রেড জোন গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে দেশের প্রথম ফ্রি ট্রেড জোন স্থাপন করা হচ্ছে। প্রায় ৪০০ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে যাওয়া এফটিজেডের বিষয়ে ব্যাংকগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট বৈদেশিক মুদ্রা নির্দেশনা ছিল না। এতে অর্থায়ন, ঝুঁকি নিরূপণ এবং হিসাবায়নে অনিশ্চয়তা তৈরির ঝুঁকি ছিল। প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সেই শূন্যতা পূরণ হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এফটিজেডে উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ ও রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান, অনুমোদিত ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান এবং অনুমোদিত লজিস্টিকস সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান আমদানি করতে পারবে। সংরক্ষণ, গুদামজাত বা বিতরণের উদ্দেশ্যে কনসাইনমেন্ট ভিত্তিতে পণ্য আনা যাবে। তবে উৎপাদনে ব্যবহার কিংবা চূড়ান্ত ক্রেতার কাছে বিক্রির আগ পর্যন্ত পণ্যের আইনগত মালিকানা বিদেশী সরবরাহকারীর কাছেই থাকবে।

এ কারণে ব্যাংকগুলোকে ওই পণ্যকে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের ইনভেন্টরি বা সম্পদ হিসেবে বিবেচনা না করার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অর্থাৎ মালিকানা হস্তান্তরের আগে ওই পণ্যের বিপরীতে ঋণ বিতরণ বা ঝুঁকি হিসাব করা যাবে না। উৎপাদনে ব্যবহার অথবা বিক্রয়ের মাধ্যমে মালিকানা পরিবর্তন এবং বিল অব এন্ট্রিসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিশ্চিত হওয়ার পরই কেবল অর্থায়ন করা যাবে।

নির্দেশনায় আরো বলা হয়েছে, এফটিজেড থেকে বাংলাদেশের কোনো ক্রেতা পণ্য কিনলে সেটি আমদানি হিসেবে বিবেচিত হবে। ফলে প্রচলিত আইএমপি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। অন্যদিকে এফটিজেডের কোনো প্রতিষ্ঠান দেশীয় ক্রেতার কাছে প্রস্তুত বা আধা-প্রস্তুত পণ্য বিক্রি করলে বিক্রেতার জন্য তা রফতানি এবং ক্রেতার জন্য আমদানি হিসেবে গণ্য হবে। সে ক্ষেত্রে যথাক্রমে ইএক্সপি ও আইএমপি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এসব লেনদেনের অর্থ পরিশোধ অবাধে রূপান্তরযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রায় করতে হবে। একই সঙ্গে আমদানি দায় পরিশোধের সুবিধার্থে এফটিজেডের প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশী মুদ্রায় নির্ধারিত মার্জিন হিসাবে বিক্রয়লব্ধ অর্থ জমা রাখতে পারবে। নীতিমালায় কনসাইনমেন্ট-ভিত্তিক আমদানীকৃত পণ্য ৪৮-৬০ মাস পর্যন্ত ফ্রি ট্রেড জোনে সংরক্ষণের সুযোগ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে বায়ার্স ক্রেডিট বা সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট সুবিধাসহ ইউস্যান্স আমদানির সর্বোচ্চ মেয়াদ ২৭০ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।

ব্যাংকগুলোর জন্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিষয়েও কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, অর্থায়নের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিদেশী সরবরাহকারী ও ক্রেতার সঙ্গে চুক্তি, মালিকানা কাঠামো, উৎপাদন সক্ষমতা এবং বিক্রয়চক্র যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে। প্রতিটি অর্থায়ন প্রকৃত বাণিজ্যিক লেনদেনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র দ্বারা সমর্থিত থাকতে হবে।

আরও