এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সঞ্চয়ে। দেশের গ্রামীণ এলাকার ২৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ মানুষের আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক কোনো ধরনের সঞ্চয় নেই। এসব মানুষের ৭৭ শতাংশই জানিয়েছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর পর সঞ্চয় করার মতো বাড়তি অর্থ তাদের হাতে থাকে না। অনিয়মিত ও অপর্যাপ্ত আয়, দায়-দেনা পরিশোধসহ নানা কারণেও সঞ্চয় করতে পারছেন না তারা।
প্রায় তিন বছর ধরে দেশের গ্রামীণ এলাকার মানুষের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে জরিপ পরিচালনা করছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইএনএম)। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘কম্প্রিহেনসিভ রুরাল ফাইন্যান্স স্টাডি’ প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত এ জরিপে দেশের ৩৮টি জেলার সাত হাজারেরও বেশি মানুষের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে। এ জরিপের তথ্যেই গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সঞ্চয় পরিস্থিতির এ চিত্র উঠে এসেছে।
সঞ্চয়ের দিক থেকে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে দেশের উত্তরাঞ্চলের বিভাগ রংপুর। এ বিভাগের ৪৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ গ্রামীণ মানুষের হাতে ভবিষ্যতে ব্যবহারের মতো কোনো সঞ্চয় নেই। যেসব মানুষ সঞ্চয় করছেন, তাদের মধ্যেও ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অর্থ জমা রাখার প্রবণতা খুবই কম। মাত্র ৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ মানুষ ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সঞ্চয় করছেন। অন্যদিকে ৪১ দশমিক ৫৬ শতাংশ মানুষ ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বা এনজিওর কাছে অর্থ জমা রাখছেন।
সঞ্চয়ে পিছিয়ে থাকা দ্বিতীয় বৃহত্তম বিভাগ সিলেট। এ বিভাগের ৩৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ গ্রামীণ মানুষের কোনো আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক সঞ্চয় নেই। এছাড়া চট্টগ্রামে এ হার ৩০ দশমিক ৬৩ শতাংশ, ঢাকায় ২৬ দশমিক ৯২, খুলনায় ২১ দশমিক ৫৬, রাজশাহীতে ১৯ দশমিক ৪, ময়মনসিংহে ১৩ দশমিক ৩৩ এবং বরিশালে ১০ দশমিক ৬৩ শতাংশ। সব মিলিয়ে দেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ২৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ মানুষ মৌলিক চাহিদা মেটানোর পর সঞ্চয় করার মতো কোনো অর্থ হাতে রাখতে পারেন না।
সঞ্চয় করতে না পারার প্রধান কারণ হিসেবে জীবনযাত্রার ব্যয়ের উচ্চ চাপকে চিহ্নিত করেছেন ৭৭ শতাংশ মানুষ। তাদের মতে, মৌলিক চাহিদা পূরণ করতেই আয়ের পুরোটা শেষ হয়ে যায়। এছাড়া ৩২ শতাংশ মানুষ অনিয়মিত আয় এবং ২২ শতাংশ অপর্যাপ্ত আয়কে প্রধান বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আরো ১৫ শতাংশ জানিয়েছেন, দায়-দেনা পরিশোধ করতেই তাদের আয়ের পুরো অর্থ ব্যয় হয়ে যায়। ফলে সঞ্চয় করার মতো ‘বাড়তি’ কোনো অর্থ তাদের হাতে থাকে না।
আইএনএমের জরিপ পরিচালনা দলের সদস্য ও সংস্থাটির গবেষণা ফেলো ড. ফারহানা নার্গিস বলেন, ‘সঞ্চয়ের সুনির্দিষ্ট সুফল থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের গ্রামীণ পরিবারগুলো প্রায়ই আনুষ্ঠানিক সঞ্চয় ব্যবস্থার সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বাধার মুখোমুখি হয়। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, নিম্ন স্বাক্ষরতার হার, সীমিত আর্থিক সচেতনতা, অনিয়মিত আয়ের ধরন এবং অনানুষ্ঠানিক সঞ্চয় অভ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এসব চ্যালেঞ্জ তৈরিতে ভূমিকা রাখে।’
তিনি বলেন, ‘স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এনজিওগুলোকে কাজে লাগিয়ে কমিউনিটিভিত্তিক আর্থিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে গ্রামীণ জনগণকে আর্থিক ব্যবস্থাপনা, সঞ্চয় এবং আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবার সুফল সম্পর্কে সচেতন করা সম্ভব।’
গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সঞ্চয়ের হার বাড়াতে ব্যাংক খাতেও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন ড. ফারহানা নার্গিস। তার মতে, অনগ্রসর ও প্রান্তিক গ্রামীণ এলাকায় আরো শাখা ও উপশাখা খোলার জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা ও প্রণোদনা দিতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হঠাৎ অসুস্থতা, চাকরি বা কাজ হারানো কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো আকস্মিক বিপদ মোকাবেলায় সঞ্চিত অর্থ একটি শক্তিশালী নিরাপত্তাবেষ্টনী হিসেবে কাজ করে। নিয়মিত সঞ্চয় না থাকলে এসব পরিস্থিতিতে মানুষকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়। পরবর্তী সময়ে এ ঋণের বোঝা দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকট তৈরি করতে পারে। শিক্ষা, নিজস্ব বাসস্থান কিংবা অবসরের মতো দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য পূরণেও সঞ্চয়ের গুরুত্ব রয়েছে। নিয়মিত সঞ্চয় মানুষকে দৈনন্দিন জীবিকা নির্বাহের মানসিক চাপ থেকে যেমন কিছুটা মুক্তি দেয়, তেমনি নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতা ও মানসিক শান্তিও বাড়ায়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যক্তি পর্যায়ে সঞ্চয় বাড়লে জাতীয় পর্যায়েও মূলধন গঠনের সুযোগ তৈরি হয়। এর মাধ্যমে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গতিশীল হতে পারে। সঞ্চয় ভবিষ্যতের বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি এবং অর্থের মান ধরে রাখতে সহায়তা করে। ছোট ছোট সঞ্চয় সময়ের সঙ্গে লাভজনক ব্যবসা বা সম্পদে পরিণত হয়ে আয়ের নতুন উৎসও তৈরি করতে পারে।
ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি ও কম বৈচিত্র্যপূর্ণ গ্রামীণ অর্থনীতির কারণে প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের হাতে সঞ্চয়যোগ্য অর্থ থাকছে না বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘গত চার বছর দেশের অর্থনীতি নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে মূল্যস্ফীতি ক্রমাগত বেড়েছে, অন্যদিকে সে অনুপাতে মজুরি বাড়েনি। উপরন্তু নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির হারও স্থবির ছিল।’
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বিশেষত গ্রামীণ অর্থনীতিতে আয়ের উৎসের বৈচিত্র্য অনেক কম থাকায় সেখানকার মানুষের ওপর আর্থিক চাপের প্রভাব পড়েছে সবচেয়ে বেশি। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর হাতে সাধারণত পর্যাপ্ত নগদ অর্থ থাকে না। ফলে বিদ্যমান সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাতে গিয়ে তাদের পুঁজি দিন দিন তলানিতে ঠেকছে। একই সঙ্গে গ্রামে কাজের সুযোগ সংকুচিত হওয়া এবং প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়ায় তাদের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে।’
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় ২০২২ সালের পর দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়তে শুরু করে। এরপর থেকে মূল্যস্ফীতির হার আর নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। উচ্চ মূল্যস্ফীতির ধারা অব্যাহত থাকলেও সে হারে মজুরি বাড়েনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত টানা পাঁচ অর্থবছরই গড় মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কম ছিল। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মজুরি বেড়েছে ৮ দশমিক ১১ শতাংশ। বিপরীতে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ। অর্থাৎ মজুরি বৃদ্ধির তুলনায় মূল্যস্ফীতি ছিল দশমিক ৫৭ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।
গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর এ সংকট নিরসনে প্রথমত আয়ের উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করেন ড. ফাহমিদা খাতুন। তার মতে, শুধু প্রথাগত কৃষির ওপর নির্ভর না করে গ্রামীণ এলাকায় কৃষি প্রক্রিয়াকরণ কারখানা, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প এবং অকৃষি খাতের বিকাশে জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রথাগত কাজের বাইরে তরুণদের বিভিন্ন কারিগরি ও ডিজিটাল দক্ষতা প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। এতে স্থানীয় ও বৈশ্বিক বাজারের উপযোগী নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি হবে, যা তাদের আয় বৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখবে।
গ্রামীণ পরিবারগুলোর সঞ্চয় সক্ষমতা কমে যাওয়ার আরেকটি বড় কারণ খাদ্য ব্যয়ের চাপ। বাংলাদেশে ৬০ শতাংশেরও বেশি পরিবার তাদের মোট আয়ের অন্তত অর্ধেক খাবারের পেছনে ব্যয় করে। বিবিএসের গত বছরের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গ্রামীণ এলাকার ৩১ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার আয়ের ৬৫ শতাংশ বা তার বেশি খাবারের পেছনে ব্যয় করে। ফলে দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহের পর তাদের পক্ষে সঞ্চয় করা আরো কঠিন হয়ে পড়ছে।