টাঙ্গাইলের
ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পের মালিক-শ্রমিকরা সারা বছরে দুটি ঈদ, পহেলা বৈশাখ ও দুর্গাপূজার জন্য
অপেক্ষা করেন। এ উৎসবগুলো তাদের
লাভের প্রধান উৎস। তবে গত তিন বছর
করোনা মহামারীর কারণে বন্ধ ছিল টাঙ্গাইলে অধিকাংশ তাঁত। এতে তাদের লাখ লাখ টাকার লোকসান গুণতে হয়েছে। গত বছর ঈদে
কিছুটা আশার আলো দেখার সুযোগ হলেও সুতা ও রঙের মূল্য
বৃদ্ধি ও পাওয়ার লুমের
কারণে হিমশিম খাচ্ছেন তাঁত মালিকরা। পাওয়ার লুমের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে হ্যান্ড লুমের তৈরি শাড়ি।
সরেজমিনে টাঙ্গাইলের তাঁতপল্লীতে গিয়ে দেখা গেছে, ঈদকে ঘিরে শাড়ি তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন তাঁতিরা। তৈরি করছেন মনোমুগ্ধকর হাইব্রিড, সুতি ও সিল্ক জামদানি, বালুচুরি, ধানসিঁড়ি, আনারকলি, সফট সিল্ক, রেশম, তসর, কাতান, একতারি, দোতারিসহ নানা ধরনের শাড়ি। এ শাড়ি তারা বাজিতপুর ও করটিয়া হাটে সপ্তাহে দুদিন বিক্রি করেন। এছাড়া দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকার এসে শাড়ি নিয়ে যান।
টাঙ্গাইল জেলার সদর উপজেলার বেলতা, পোড়াবাড়ি, ধুলটিয়া, বাজিতপুর, সুরুজ, বার্থা, বামনকুশিয়া, তারটিয়া ও দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইল, চন্ডি, ধুলুটিয়া, নলুয়া, দেওজান, নলশোঁধা, বিষ্ণুপুর, মঙ্গলহোড়, বাসাইল উপজেলার বাথুলী, ফুলকি, নাগরপুর উপজেলার কেদারপুর, বারাপোষা, কালিহাতী উপজেলার বল্লা-রামপুর গ্রামে সচল থাকলেও করোনার কারণে প্রায় ৫০ শতাংশ তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে।
১৯৯২ সালের তথ্যানুযায়ী, টাঙ্গাইল জেলায় এক লাখের অধিক তাঁত ছিল এবং দেড় লাখ তাঁতি টাঙ্গাইল সদর, কালিহাতি, নাগরপুর ও বাসাইল উপজেলায় বসবাস করতেন। ২০১৩ সালের একটি শুমারিতে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, টাঙ্গাইল জেলায় ৬০ হাজার তাঁত রয়েছে। এর মধ্যে ৮ হাজার ৩০৫টি পিট তাঁত, ৫১ হাজার ১৪১টি চিত্তরঞ্জন তাঁত ও ৮৯২টি পাওয়ার তাঁত।
তাঁত শ্রমিক মনোয়ার মোল্লা বলেন, ‘আমি এ পেশায় কাজ করি ৪৫ বছর ধরে। তাঁতে শাড়ি সম্পূর্ণ তৈরি হয় হাতে। একটি জামদানি শাড়ি তৈরি করতে সময় লাগে তিন-চারদিন। বেচা হয় ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা। মজুরি পাই মাত্র ১ হাজার টাকা। ছেলে-মেয়ে নিয়ে আমাদের অনেক কষ্ট করে চলতে হয়। বেশির ভাগই এ পেশা ছেড়ে চলে গেছে। আমি যেতে পারিনি। কারণ অন্য কোনো কাজ আর শিখিনি। বয়সও হয়েছে অনেক। এখন এ কাজই ঠিকমতো করতে পারি না। আমাদের মজুরি বাড়িয়ে দিলে ভালো হতো।’
তাঁত শ্রমিক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘পাওয়ার লুমের শাড়ি অনেক কম সময়ে, স্বল্প খরচে। আর আমরা যারা হ্যান্ড লুমে শাড়ি তৈরি করি তাতে সময় ও খরচ দুটোই বেশি লাগে। আর আমাদের মজুরিও অনেক কম।’
টাঙ্গাইল শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রঘুনাথ বসাক বলেন, ‘আমাদের এ সেক্টরটা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে পাওয়ার লুম। পাওয়ার লুমের শাড়িতে হাট ছয়লাব। আমাদের প্রতিবেশী হাট (বাজিতপুর, করোটিয়া) বাজারগুলোতে হ্যান্ড লুমের কোনো কাপড়ই নেই। অথচ এসব হাট টাঙ্গাইলের শাড়ির হাট বলে পরিচিত। এসব হাটে এখন পাওয়ার লুম বা পাবনা এ-জাতীয় শাড়িগুলোকে টাঙ্গাইলের শাড়ি বলে বিক্রি করা হয়। এর ফলে ক্রেতারা ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রতারিত হচ্ছে। তাঁতিরাও পুঁজি হারাচ্ছেন। আর তাঁতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া মানে এ শিল্প ধ্বংস হওয়া।
তিনি আরো বলেন, করোনা মহামারী থেকে আমাদের যে দুরবস্থা চলছে তা কাটিয়ে ওঠা অনেক কঠিন। সামান্য পুঁজির অভাবে এ সেক্টরটা বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এ সেক্টরের বাজার ব্যবস্থাপনা দরকার। সরকারের কাছে আবেদন এ হ্যান্ড লুমকে বাঁচানোর জন্য সামান্য কিছু পুঁজি বিনিয়োগ করুন।’
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড লিয়াজোঁ অফিসার রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে তাঁত মালিকদের সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা ঋণ সুবিধা দেয়া হয়েছে। তাঁত বোর্ড টাঙ্গাইলের শাড়ির বাজার নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীর কারওয়ানবাজারে শুধু টাঙ্গাইলের শাড়ির জন্য মার্কেট প্রমোশনের কাজ চলছে। এছাড়া টাঙ্গাইল সদর ও দেলদুয়ার উপজেলাতেও মার্কেট প্রমোশনের জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’