গতকাল বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেলের সই করা এক চিঠিতে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।
চিঠিতে বিটিএমএ জানায়, দেশের প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্প খাতের সর্ববৃহৎ জাতীয় বাণিজ্য সংগঠন হিসেবে তাদের প্রায় ১ হাজার ৮৮৩টি সদস্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে। স্পিনিং, উইভিং, ডেনিম, ডায়িং, প্রিন্টিং ও ফিনিশিং শিল্প নিয়ে গড়ে ওঠা এ খাতে প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলারের প্রত্যক্ষ বেসরকারি বিনিয়োগ রয়েছে। দেশের মোট রফতানি আয়ের ৮৫ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাত থেকে আসে, যার প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ সহায়তা দেয় দেশীয় প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্প। এ খাত জাতীয় জিডিপিতে প্রায় ১৩ শতাংশ অবদান রাখার পাশাপাশি বছরে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ সুতা ও কাপড় আমদানি প্রতিস্থাপন করে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করছে। প্রত্যক্ষভাবে প্রায় এক কোটি এবং পরোক্ষভাবে প্রায় চার কোটি মানুষের জীবিকা এ শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
সংগঠনটি বলেছে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক সংঘাত, জ্বালানি ও ইউটিলিটি ব্যয় বৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, টাকার অবমূল্যায়ন এবং চলতি মূলধনের ঘাটতির কারণে অধিকাংশ টেক্সটাইল মিল তীব্র আর্থিক চাপে রয়েছে। উৎপাদন কমে যাওয়ার পরও শ্রমিকের মজুরি, ব্যাংক ঋণের কিস্তি ও সুদ, ইউটিলিটি বিলসহ স্থায়ী ব্যয় বহন করতে হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের মূলধন ক্ষয় হয়েছে। ফলে অনেক কারখানা আংশিক সক্ষমতায় চলছে, আবার অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। এতে উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি ব্যাংক খাতও অনাদায়ী ঋণ (এনপিএল) বৃদ্ধির ঝুঁকিতে পড়ছে।
বিটিএমএর ১০ দফা প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে, ‘বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত সহায়ক প্রাক-অর্থায়ন স্কিম’-এর আওতায় প্রকল্প বা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সিআইবি মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু এবং বিআরপিডি সার্কুলার নং-০৭/২০২৪-এর ব্যাখ্যা আরো স্পষ্ট করে সব ব্যাংকের জন্য অভিন্ন নির্দেশনা জারি, যাতে একই গ্রুপের নিয়মিত ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানগুলো অযৌক্তিকভাবে ব্যাংকিং সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয়।
প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন (বিএমআরই), জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি ও উৎপাদন ব্যয় কমাতে গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ডের (জিটিএফ) আকার বৃদ্ধি, সুদের হার বিনিয়োগবান্ধব পর্যায়ে পুনর্নির্ধারণ, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি এবং পরিবেশবান্ধব জিরো লিকুইড ডিসচার্জ (জেডএলডি) প্লান্টকে অর্থায়নের আওতায় আনার প্রস্তাবও দিয়েছে সংগঠনটি। এক্ষেত্রে ভারতের ‘দ্য অ্যামেন্ডেড টেকনোলজি আপগ্রেডেশন ফান্ড স্কিম’-এর (এটিইউএফএস) অনুরূপ সহায়তা কাঠামো বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের ব্যবসা ও আর্থিক পুনর্গঠনসংক্রান্ত আবেদন দাখিলের সময়সীমা ৩০ জুনের পরিবর্তে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বাড়ানো, রফতানিমুখী স্পিনিং, টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য ব্যাংক ঋণের কার্যকর সুদের হার পুনরায় ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা ও ব্যাক টু ব্যাক এলসির আওতায় দেশীয় টেক্সটাইল মিলের সরবরাহ করা সুতা ও ফ্যাব্রিকের বিপরীতে অ্যাকসেপ্টেড বা ম্যাচিউরড বিলের অর্থ ডকুমেন্ট পাওয়ার সাত কর্মদিবসের মধ্যে পরিশোধ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বাধ্যতামূলক নির্দেশনা জারির দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বিআরপিডি সার্কুলার নং-১০/২০১২ ও ১৩/২০১২ সংশোধন করে ট্রাক ডেলিভারি চালানের তারিখকে ম্যাচিউরিটি ডেট হিসেবে গণ্য করা এবং অর্থ পরিশোধে বিলম্ব হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিযোগ পোর্টালে অভিযোগ দাখিল ও দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
বিটিএমএ আরো বলেছে, মেয়াদি ঋণের শ্রেণীকরণে বর্তমান তিনটি ওভারডিউ কিস্তির পরিবর্তে আগের মতো ছয়টি কিস্তি বিবেচনা করা, এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের (ইডিএফ) প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সীমা বর্তমান ২০ মিলিয়ন ডলারের পরিবর্তে সর্বশেষ ১২ মাসে প্রত্যাবাসিত রফতানি আয়ের ৬৫ শতাংশ নির্ধারণ, ইডিএফ ঋণের সুদের হার পুনরায় মোট ২ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং তহবিলের আকার বাড়ানো প্রয়োজন।
এছাড়া ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি ও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে চলমান জটিলতার কারণে এলসি, বিল নিষ্পত্তি, আমদানি-রফতানি ও স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা দূর করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর নীতিগত হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।
চিঠিতে বিটিএমএ বলেছে, এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে রফতানিমুখী প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্প পুনরুজ্জীবিত হবে, রফতানি আয় ও কর্মসংস্থান বাড়বে। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের ঝুঁকি কমবে, ঋণ পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত হবে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বাড়বে এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আরো শক্তিশালী হবে।
জাতীয় অর্থনীতি, শিল্পায়ন ও ব্যাংক খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনায় প্রস্তাবগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।