গ্রিসে ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে জনসংখ্যা। এ সমস্যা মোকাবেলায় কর খাতে সংস্কারসহ নানা আর্থিক পদক্ষেপ গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে দেশটি। সব মিলিয়ে ক্রমহ্রাসমান জনসংখ্যার সমস্যা মোকাবেলায় রোববার (৭ সেপ্টেম্বর) মোট ১৬০ কোটি ইউরোর কর প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে দেশটি।
একই সঙ্গে যেসব পরিবারে সন্তানের সংখ্যা বেশি সেগুলোকে আর্থিক সহায়তার ঘোষণাও দিয়েছে দেশটি। গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিতসোতাকিস এ সংক্রান্ত নীতিসহায়তা ঘোষণা করতে গিয়ে রোববার বলেন, ‘আমরা জানিয়ে যেকোনো পরিবারে যদি একটি সন্তান থাকে; তাহলে জীবনযাত্রার ব্যয় একরকম। আর যদি দুটি-তিনটি থাকে; তাহলে আরেকরকম। সুতরাং রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের উচিত, যারা সন্তান গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তাদের পুরস্কৃত করার পথ খুঁজে বের করা।
গ্রিস সরকারের নতুন এ প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় সব ধরনের কর ব্র্যাকেটে (আয়ভিত্তিক করসীমার বিভিন্ন ধাপ) ২ শতাংশীয় পয়েন্ট ছাড় দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি চার সন্তান যুক্ত নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর করহার শূন্য করে দেয়াসহ আরো নানামুখী পদক্ষেপের ঘোষণা করা হয়েছে। এটি ২০২৬ সাল থেকে কার্যকর হবে। ঘোষণা দেয়ার সময় প্যাকেজটিকে গ্রিসের কর খাতে গত অর্ধশতকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে সাহসী সংস্কারমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দাবি করেন কিরিয়াকোস মিতসোতাকিস।
বর্তমানে গোটা ইউরোপে সবচেয়ে কম ফার্টিলিটি রেট বা উর্বরতার হার গ্রিসে। প্রতি নারীর গড় সন্তান জন্মদানের সংখ্যা ১ দশমিক ৪। প্রজনন হারও জনসংখ্যার শূন্য বৃদ্ধি হারের (যখন মৃত্যুহার ও জন্মহার সমান হয়ে জনসংখ্যা একটি জায়গায় স্থবির থাকে) অনেক নিচে। বিষয়টি এখন গ্রিসের জন্য ‘জাতীয় হুমকি’ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী।
বর্তমানে দেশটির মোট জনসংখ্যা ১ কোটি ২ লাখ। বর্তমান অবস্থা বজায় থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে তা ৮০ লাখের নিচে নেমে আসবে বলে আশঙ্কা করা হ্চ্ছে। ওই সময়ে এ ৮০ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ৩৬ শতাংশেরই বয়স থাকবে ৬৫ বছরের ওপরে।
দীর্ঘসময়ের অর্থনৈতিক সংকট গ্রিসকে এ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক সংবাদ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশটি দীর্ঘদিন ধরে কৃচ্ছতাসাধনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দাতাদের কাছ থেকে দেউলিয়াত্ব ঠেকাতে নেয়া ঋণের অর্থ পরিশোধের চেষ্টা চালিয়েছে। আর এ অর্থনৈতিক কৃচ্ছতার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে দেশটির তরুণ জনগোষ্ঠীর ওপর। এ সংকটের মধ্যে কাজের সন্ধানে বিশ্বের অন্যান্য দেশে পাড়ি জমিয়েছেন ৫ লাখেরও বেশি গ্রিক নাগরিক। তাদের অধিকাংশই মূলত তরুণ ও মেধাবি জনগোষ্ঠী। বর্তমানে গ্রিসের অর্থনীতির অনেকটাই পুনরুদ্ধার হয়ে এসেছে। দেশটির সরকারও তরুণদের দেশত্যাগের প্রবণতাকে উল্টে দিতে জোর প্রয়াস চালাচ্ছে।
গ্রিসের অর্থমন্ত্রী কিরিয়াকোস পিয়েরাকাকিস জানিয়েছেন, দেড় দশক আগে আর্থিক সংকট শুরুর পর থেকে গ্রিসে উর্বরতার হার কমে অর্ধেকে নেমেছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের কর খাতের সংস্কারে এ সমস্যাটির ওপরে ব্যাপক মাত্রায় জোর দেয়া হচ্ছে। গ্রিসের অর্থনৈতিক টিমের প্রধান হিসেবে আমি বলতে চাই, এ মুহূর্তে জনমিতিই আমাদের সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ইস্যু।’
নতুন পদক্ষেপের আওতায় ১ হাজারের কম বাসিন্দা সংবলিত গ্রামীণ এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের জন্য কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতাতে কমিয়ে আনা হচ্ছে। আর এ করদায় হ্রাসজনিত ঘাটতি পূরণ করা হবে জাতীয় উদ্বৃত্তের অর্থ থেকে।
দেশটির আর্থিক খাত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, উর্বরতার হার কমে যাওয়ায় বর্তমান ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কালে গ্রিসের পেনশন, স্বাস্থ্য খাত, শ্রমবাজার ও জাতীয় নিরাপত্তা খাত অভূতপূর্ব এক ঝুঁকির মধ্যে পতিত হয়েছে।