নেতৃত্বে থাকা তীর ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেল বাজারজাতকারী সিটি গ্রুপসহ একাধিক করপোরেট জায়ান্ট আমদানি, পরিশোধন ও বিপণন কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করেছে। বসুন্ধরা ও এস আলমের মতো বড় গ্রুপ কার্যত বাজার থেকেই ছিটকে পড়েছে। বর্তমানে সয়াবিন ও পাম তেল বড় পরিসরের আমদানি এবং সরবরাহ মূলত টি কে গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই) ও আবুল খায়ের—এ তিন কনগ্লোমারেটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বিশেষত সয়াবিন তেলের আমদানি ও পরিশোধন অনেকটা এককভাবেই টি কে গ্রুপের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। এদিকে ভোজ্যতেলের ঋণপত্র (এলসি) খোলার হার কমে যাওয়ায় আসন্ন ঈদুল আজহার আগেই সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকট প্রকট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সরকারের নির্ধারিত ফর্মুলা অনুযায়ী, ভোজ্যতেলের মূল্য সমন্বয় না করা হলে দেশের বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে না বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে জানিয়েছে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। সম্প্রতি সংগঠনটির পক্ষ থেকে দেয়া এক চিঠিতে বলা হয়, সর্বশেষ ৮ ডিসেম্বর দেশে ভোজ্যতেলের মূল্য সমন্বয় করা হয়েছিল, যখন আন্তর্জাতিক বাজারে ভিত্তিমূল্য ছিল প্রতি টন ১ হাজার ১০০ ডলার। তবে মূল্য নির্ধারণের পর পরই বিশ্ববাজারে দামের ঊর্ধ্বগতি শুরু হয়, এরই মধ্যে প্রায় ৩০০ ডলার বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের এ ঊর্ধ্বগতির বিষয়টি একাধিকবার মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হলেও মূল্য সমন্বয়ের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এ অবস্থায় সরকারের অনুরোধে আমদানিকারকরা উচ্চমূল্যে তেল আমদানি করে বাজারে সরবরাহ অব্যাহত রাখেন, যদিও এতে বড় অংকের লোকসান গুনতে হয়েছে।
চিঠিতে আরো বলা হয়, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে দ্রুত মূল্য সমন্বয় না হলে আমদানি কার্যক্রম অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। পাশাপাশি বোতলজাতে ব্যবহৃত কাঁচামালের মূল্যও প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে, যা উৎপাদন ব্যয় আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আমদানি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) দেশে সয়াবিন ও পাম অয়েল মিলিয়ে প্রায় ৭ লাখ টন আমদানি হয়েছে, যার কাস্টমস শুল্কায়িত মূল্য ৯ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল ২ লাখ ৬০ হাজার টন, যার মূল্য ৩ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা। অন্যদিকে পরিশোধিত পাম অয়েল আমদানি হয়েছে ৪ লাখ ৪৫ হাজার টন, যার মূল্য ৫ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা।
এনবিআরের তথ্যানুযায়ী, সয়াবিন তেল আমদানিতে প্রায় এককভাবে সক্রিয় রয়েছে টি কে গ্রুপ। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে প্রতিষ্ঠানটি ১ লাখ ৪ হাজার টন আমদানি করে বাজারে সরবরাহ ধরে রেখেছে। এর পরই রয়েছে বাংলাদেশ এডিবল অয়েল লিমিটেড (বিইওএল), প্রতিষ্ঠানটি এনেছে ৫৬ হাজার ১৭৯ টন। এছাড়া সেনা এডিবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ ৩৬ হাজার ২৫০ টন, সিটি গ্রুপ ২৩ হাজার ৭৪০ টন, আবুল খায়ের গ্রুপ ২২ হাজার ৫১৬ টন এবং এমজিআই ১১ হাজার ৫০০ টন সয়াবিন তেল আমদানি করেছে। ভোজ্যতেলের নেতৃত্বে থাকা সিটি গ্রুপ এনেছে ২৩ হাজার ৭৪৫ টন।
তবে পাম অয়েল আমদানিতে তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে তিন শিল্প গ্রুপ। এ বছরের প্রথম তিন মাসে আবুল খায়ের গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান স্মাইল ফুড প্রডাক্টস লিমিটেড এনেছে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৬০০ টন। একই সময়ে এমজিআই আমদানি করেছে ১ লাখ ৩২ হাজার ৯০০ টন এবং টি কে গ্রুপ ১ লাখ ১৮ হাজার ৫০০ টন। সিটি গ্রুপ এনেছে ৬ হাজার ৫০০ টন পাম।
অন্যদিকে ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন বীজ আমদানি করে দেশেই ভোজ্যতেল উৎপাদন করছে কয়েকটি শিল্প গ্রুপ। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে এমজিআই ও ডেল্টা এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের আমদানি করা সয়াবিন বীজ মাড়াই করে প্রায় ৭৫ হাজার টন সয়াবিন তেল উৎপাদন হয়েছে।
এমজিআই চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বছরের প্রথম কয়েক মাসে আমরা যে পরিমাণ সয়াবিন তেল এনেছি, বাজার স্বাভাবিক থাকলে তা কয়েক গুণ বেশি হতো। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম ১ হাজার ২০০ ডলার থেকে বেড়ে ফ্রেইট ও প্রিমিয়ামসহ হয়েছে ১ হাজার ৪০০ ডলার। একইভাবে পাম অয়েলের দামও ১ হাজার ২৫০ ডলারে পৌঁছেছে। কিন্তু সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করতে গিয়ে প্রতি কেজিতে গড়ে ৩০ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সরবরাহ শৃঙ্খল সংকুচিত হয়ে পড়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এ পরিস্থিতিতে আমরা ক্রুড সয়াবিন তেলের আমদানি কমালেও সয়াবিন বীজের আমদানি বাড়িয়ে তা মাড়াইয়ের মাধ্যমে উৎপাদন ও সরবরাহ বজায় রাখার চেষ্টা করছি।’
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে ভোজ্যতেলের আমদানিকারক ও পরিশোধনকারীদের সঙ্গে নির্দিষ্ট সময় অন্তর বৈঠকের কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের এ দূরত্বের মধ্যেই ঈদুল আজহার আগে এলসি খোলার হার বৃদ্ধির বদলে উল্টো কমে গেছে। স্বাভাবিকভাবে এলসি খুলে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল থেকে সয়াবিন তেল এসে বন্দরে পৌঁছতে তিন মাস লাগে। সরকারের নিজ উদ্যোগে ক্রয় করে ভর্তুকি দেয়ার পদক্ষেপও নেই। ফলে বর্তমানে দেশে বড় পরিসরে সয়াবিন তেল আমদানিতে কার্যত একটি এবং পাম তেলে তিনটি কোম্পানি সক্রিয় রয়েছে। এতে বাজারের সরবরাহ ব্যবস্থায়ও বড় চাপ তৈরি হচ্ছে।
টি কে গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের গ্রুপ ডিরেক্টর মোহাম্মদ মুস্তাফা হায়দার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে আগাম ক্রয়কৃত সয়াবিন তেলের গড় মূল্যও এখন ১ হাজার ২০০ ডলারের ওপরে। এর সঙ্গে আছে ফ্রেইট-প্রিমিয়াম। কিন্তু দেশে সেই অনুপাতে মূল্য সমন্বয় না হওয়ায় আমদানিকারকদের বড় ধরনের লোকসান গুনতে হচ্ছে। কয়েক মাস ধরে সরকার-ব্যবসায়ী বৈঠক না হওয়ায় নীতিগত সমন্বয়ের ঘাটতিও তৈরি হয়েছে।’
ঈদুল আজহাকে ঘিরে চাহিদা বাড়লেও এলসি খোলার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারের ক্রয়মূল্য ও স্থানীয় বাজারে বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকায় নতুন করে আমদানি বাড়ানোর ঝুঁকি নেয়ার বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। ফলে চলতি মাসে সামগ্রিক আমদানি পরিস্থিতি আরো নেতিবাচক হতে পারে। বাজারকে প্রতিযোগিতামূলকভাবে চালু রাখতে হলে হয় সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখতে হবে, না হলে নির্দিষ্ট সময় পরপর সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে বৈঠকের মাধ্যমে বাস্তবতার ভিত্তিতে মূল্য সমন্বয় করতে হবে। অন্যথায় সরবরাহ শৃঙ্খল সংকুচিত হবে এবং পুরো খাত আরো চাপে পড়বে।’
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যানুযায়ী, ভোজ্যতেলের বাজারে মার্চে দাম ৫ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে, যা টানা তিন মাস ধরে বাড়ছে। বিশেষত পাম তেলের মূল্য ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় জৈব জ্বালানি হিসেবে ভোজ্যতেলের চাহিদা বেড়েছে। পাশাপাশি পাম অয়েলের উৎপাদন কমে যাওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
২০২২ সালে নারায়ণগঞ্জে চালু হওয়া ডেল্টা এগ্রো ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ তাদের কারখানায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। এখানে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার টন অপরিশোধিত ভোজ্যতেল পরিশোধনের সক্ষমতা রয়েছে। আবার দিনে আড়াই হাজার টন সয়াবিন বীজ মাড়াই করে সয়াবিন তেল উৎপাদনের সক্ষমতাও রয়েছে কারখানাটির। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রতি মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৬০ হাজার টন সয়াবিন বীজ এনে মাড়াই করে বাজারজাত করছি। এ রকম এক চালানে প্রায় ১২ হাজার টন সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে। ভোজ্যতেলের বাজারে সরবরাহ ও দামে যে অস্থিরতা চলছে তাতে ইনভয়েসের ওপর দাম নির্ধারণ করে দেয়া উচিত।’
ভোজ্যতেলের বাজারে সর্বশেষ বড় বিনিয়োগকারী হিসেবে যুক্ত হয়েছে আবুল খায়ের গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান স্মাইল ফুড প্রডাক্টস। প্রতিষ্ঠানটির গ্রুপ চেয়ারম্যান আবুল কাশেমের একক মালিকানায় জাহাজ মার্কা ব্র্যান্ডে সয়াবিন তেল বাজারজাত করছে। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি থেকে স্মাইল ফুড প্রডাক্টস সয়াবিন ও পাম তেল আমদানির মাধ্যমে বাজারে সক্রিয় রয়েছে। বন্ধ থাকা পরিশোধন কারখানা ভাড়া নিয়ে সেখানে তেল পরিশোধন করে বাজারে সরবরাহ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারে ভোজ্যতেলের প্রকৃত মজুদ কত রয়েছে তা আগে বোঝা জরুরি। কোম্পানিগুলোর ইনভেন্টরিতে পর্যাপ্ত তেল থাকা সত্ত্বেও সরবরাহ শৃঙ্খলে কোনো সংকট তৈরি হচ্ছে কিনা, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে এরই মধ্যে দামের ঊর্ধ্বগতি থাকায় পরিস্থিতি ভিন্নও হতে পারে। সরকারের উচিত বাজারে বিদ্যমান মজুদ, তা দিয়ে কতদিন চাহিদা মেটানো সম্ভব এবং সামনে সম্ভাব্য চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বর্তমান মূল্য কাঠামো যৌক্তিক আছে কিনা পর্যালোচনা করা। আগে যেমন সরকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসে আলোচনা করে মূল্য নির্ধারণ করেছে, তেমনই একটি যৌক্তিক ও অংশগ্রহণমূলক সংলাপ আবারো শুরু করা দরকার।’