এশিয়ার এআই খাতে ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগে চাঙ্গা ওয়াল স্ট্রিটের ব্যাংক

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতকে ঘিরে এশিয়ায় বিনিয়োগ বাড়ছে দ্রুত।

এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় বিনিয়োগ ব্যাংকের আয়ে। বিশেষ করে শেয়ার লেনদেন থেকে রেকর্ড পরিমাণ আয় করছে এসব ব্যাংক। এশিয়া এখন ওয়াল স্ট্রিটের ব্যাংকগুলোর অন্যতম বড় আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে আছে জেপি মরগান চেজ, গোল্ডম্যান স্যাকস, মরগান স্ট্যানলি, ব্যাংক অব আমেরিকা ও সিটিগ্রুপ। খবর এফটি।

বিশ্বের বড় সব বিনিয়োগ ব্যাংকের গ্রাহকরা গত এক বছর এশিয়ার এমন সব প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছেন, যারা এআই সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো তৈরি করে। এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার এসকে হাইনিক্স, তাইওয়ানের টিএসএমসি ও চীনের ক্যামব্রিকন টেকনোলজিস উল্লেখযোগ্য।

বিশ্লেষকদের মতে, এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের কারণে চিপ, মেমোরি ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর চাহিদা বেড়েছে। এতে এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে বিনিয়োগও বাড়ছে। আর সে লেনদেন থেকেই বড় অংকের আয় করছে ওয়াল স্ট্রিটের ব্যাংকগুলো।

মার্কিন ব্যাংক জেপি মরগান চেজের গ্লোবাল ইকুইটিজ বিভাগের প্রধান রাশিদ আলাউই বলেন, ‘এআই শিল্পে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণকারী কোম্পানিগুলোয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এশিয়া এখন সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী অঞ্চলগুলোর একটি।’

চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) বিশ্বের বৃহৎ বিনিয়োগ ব্যাংকগুলো সম্মিলিতভাবে শেয়ার লেনদেন থেকে রেকর্ড ২ হাজার ৫৭০ কোটি ডলার আয় করেছে।

এসব ব্যাংক আয় বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে এশিয়ার বাজারের শক্তিশালী কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করেছে।

স্টক এক্সচেঞ্জের সংগঠন ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব এক্সচেঞ্জেসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত এশিয়ার শেয়ারবাজারে লেনদেনের পরিমাণ ৫২ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। একই সময় উত্তর আমেরিকায় এ পরিমাণ ছিল ৫৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার। ফলে লেনদেনের পরিমাণের দিক থেকে এশিয়া এখন উত্তর আমেরিকার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে গোল্ডম্যান স্যাকস, জেপি মরগান চেজ ও মরগান স্ট্যানলির মতো ব্যাংকগুলোর জন্য এশিয়া চলতি বছর ইউরোপের চেয়ে বেশি রাজস্ব এনে দিতে পারে। যদিও ব্যাংকগুলো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, এআই-সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ এখন বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। একই সঙ্গে এটি চীনে মার্কিন ব্যাংকগুলোর ব্যবসার জন্যও ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

কয়েক বছর আগেও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগের কারণে অনেক বিদেশী বিনিয়োগকারী এশিয়ার বাজার থেকে দূরে ছিলেন। কিন্তু এখন এআই শিল্পের বিকাশ সে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাচ্ছে।

২০২০ সালের পর থেকে বড় ব্যাংকগুলো এশিয়ায় কার্যক্রম জোরদার করেছে। এ অঞ্চলে নতুন বিনিয়োগ, জনবল বৃদ্ধি ও লেনদেন সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ এসেছে।

গোল্ডম্যান স্যাকসের গ্লোবাল কো-হেড অব ইকুইটিজ দিমিত্রি পোতিশকো বলেন, ‘গত ১৮-২৪ মাসে ব্যাংকটি এশিয়ায় বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। কারণ অঞ্চলটির বাজার আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।’

তবে এ অগ্রগতির মধ্যেও কিছু ঝুঁকি রয়েছে। ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা মনে করেন, এশিয়ার ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি ফের উত্তপ্ত হলে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে এআই-সংশ্লিষ্ট শেয়ারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

দিমিত্রি পোতিশকো বলেন, ‘এআই খাতের বর্তমান উত্থান হঠাৎ থেমে গেলে বা বিনিয়োগকারীরা একযোগে অবস্থান পরিবর্তন করলে বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।’

মরগান স্ট্যানলির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা শ্যারন ইয়েশায়া বলেন, ‘আগে এশিয়ার কথা বললে মূলত বৃহত্তর চীনকে বোঝানো হতো। পরে জাপান ও ভারতের কথা গুরুত্ব পেতে শুরু করে। এখন দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। এসব বাজারেই বছরে বছরে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, এশিয়ার বাজারের প্রবৃদ্ধি বর্তমান গতিতে চলতে থাকলে বড় ব্যাংকগুলোর জন্য অঞ্চলটি আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

জেপি মরগানের রাশিদ আলাউই বলেন, ‘গত দুই বছরের প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে প্রাইম ব্রোকারেজ ব্যবসায় এশিয়া একসময় বিশ্বের সবচেয়ে বড় অঞ্চল হয়ে উঠতে পারে।’

তিনি জানান, এশিয়ার বাজারে বিনিয়োগের চাহিদা এতটাই বেড়েছে যে কিছু ব্যাংক অন্য অঞ্চলের তুলনায় এখানে বেশি মূলধন বরাদ্দ দিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের একটি শীর্ষ বিনিয়োগ ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, এশিয়ার গ্রাহকদের বাড়তি চাহিদা মেটাতে গিয়ে বিশ্বের অন্য অঞ্চলের কিছু গ্রাহককে তুলনামূলক কম সুবিধা দিতে হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এআই-নির্ভর প্রযুক্তি শিল্পের সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকলে এশিয়ার শেয়ারবাজারে বিদেশী বিনিয়োগ আরো বাড়তে পারে। ফলে অঞ্চলটি শুধু প্রযুক্তি উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবেই নয়, বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবেও আরো শক্ত অবস্থান তৈরি করবে।

আরও