পরিশোধনাগারে যুদ্ধের ধাক্কা

জাহাজের জ্বালানি তেল সংকটের আশঙ্কা

বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে পরিশোধনাগারগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ ও সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি তেলের বাজারে নতুন করে সংকট তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে জাহাজ ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহৃত ফুয়েল অয়েলের সরবরাহে ঘাটতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এ ঘাটতি আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা। এতে জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের ব্যয় বাড়বে। একই সঙ্গে পণ্য পরিবহনের ভাড়াও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। খবর রয়টার্স।

বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে পরিশোধনাগারগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। একই সময় ট্যাংকার চলাচলেও তৈরি হয়েছে নানা বাধা। ফলে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহ বড় ধরনের ধাক্কা না খেলেও পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের বাজারে চাপ বাড়ছে।

পরিশোধনাগারগুলোও এখন বেশি লাভের আশায় ডিজেল, গ্যাসোলিন ও জেট ফুয়েল উৎপাদন বাড়াচ্ছে। ফলে জাহাজের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত ফুয়েল অয়েলের উৎপাদন ও সরবরাহ কমছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনার্জি অ্যাসপেক্টসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, তৃতীয় প্রান্তিকে বিশ্ববাজারে ফুয়েল অয়েলের দৈনিক ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ১৮ হাজার ব্যারেলে। ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের পর এবারই প্রথম প্রতিষ্ঠানটি ফুয়েল অয়েলে ঘাটতির পূর্বাভাস দিয়েছে। সে সময় ঘাটতি ছিল দৈনিক ছয় হাজার ব্যারেল।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রিস্ট্যাডের বিশ্লেষক ভ্যালেরি পানোপিও বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহ সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় তৃতীয় প্রান্তিকে ফুয়েল অয়েলের সরবরাহ পরিস্থিতি খুবই সংকটপূর্ণ থাকতে পারে।’

এশিয়ায় প্রভাব বেশি

ফুয়েল অয়েলের সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এশিয়া। কারণ এ অঞ্চলের দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা জ্বালানির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। ইরান যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি সরবরাহে বাধা তৈরি হয়েছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাহাজের জ্বালানি সরবরাহ কেন্দ্র সিঙ্গাপুর। দেশটির ফুয়েল অয়েলের দৈনিক চাহিদা প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল। এর অর্ধেকের বেশি আমদানি করা হয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও সিঙ্গাপুরের বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

জাহাজে ব্যবহৃত জ্বালানির দাম এরই মধ্যে বাড়তে শুরু করেছে। সিঙ্গাপুরের বাজারে প্রধান জাহাজ জ্বালানি ভেরি লো সালফার ফুয়েল অয়েলের (ভিএলএসএফও) দাম ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতি টনে প্রায় ৮২৫ ডলারে উঠেছে। অর্থাৎ ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১৩০ ডলার। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ জ্বালানির দাম বেড়েছে ৭৬ শতাংশ।

অন্যদিকে একই সময় আন্তর্জাতিক বাজারের প্রধান জ্বালানি তেল ব্রেন্টের দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের তুলনায় জাহাজের জ্বালানি তেলের দাম অনেক দ্রুত বেড়েছে। এতে জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি ব্যয় বেড়ে গেলে জাহাজে পণ্য পরিবহনের মোট ব্যয়ও বাড়ে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পণ্যের দামের ওপর।

ডিজেল-গ্যাসোলিনে বেশি লাভ

ফুয়েল অয়েলের সংকটের অন্যতম কারণ পরিশোধনাগারগুলোর উৎপাদন কৌশলে পরিবর্তন। বর্তমানে ডিজেল, গ্যাসোলিন ও জেট ফুয়েলের দাম ও চাহিদা বেশি। ফলে পরিশোধনাগারগুলো এসব পণ্য উৎপাদনে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

নাইজেরিয়ার ৬ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল দৈনিক সক্ষমতার ডাঙ্গোটে পরিশোধনাগার এর একটি উদাহরণ। প্রতিষ্ঠানটি ডিজেল, গ্যাসোলিন ও জেট ফুয়েলের রফতানি বাড়িয়েছে। একই সময় ফুয়েল অয়েলের রফতানি কমেছে।

এনার্জি অ্যাসপেক্টসের বিশ্লেষক রয়স্টন হুয়ান জানান, বিশ্বজুড়ে গ্যাসোলিন ও ডিজেলের মজুদ রেকর্ড নিম্নপর্যায়ে রয়েছে। এ কারণে পরিশোধনাগারগুলো ফুয়েল অয়েলকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে অন্যান্য জ্বালানি উৎপাদন বাড়াতে উৎসাহিত হচ্ছে। এতে ফুয়েল অয়েলের সরবরাহ আরো কমে যেতে পারে।

মজুদ কমেছে বড় কেন্দ্রগুলোয়

ফুয়েল অয়েলের মজুদও দ্রুত কমছে। রয়টার্সের সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, সিঙ্গাপুর, এআরএ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহর মতো বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি জ্বালানি বাণিজ্য কেন্দ্রে ফুয়েল অয়েলের মজুদ গত তিন বছরের মৌসুমি গড়ের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম।

এ পরিস্থিতিতে জাহাজ চলাচলের পথও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। লোহিত সাগর ও বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে অনেক জাহাজ দীর্ঘ পথ ঘুরে চলাচল করছে। ইয়েমেনভিত্তিক হুথি গোষ্ঠীর হামলার আশঙ্কায় কিছু জাহাজ পুরো লোহিত সাগর এড়িয়ে যাচ্ছে।

দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হলে জাহাজে বেশি জ্বালানি লাগে। ফলে ফুয়েল অয়েলের চাহিদাও বাড়ছে। কিন্তু একই সময় সরবরাহ কমে যাচ্ছে। এতে বাজারে ঘাটতির চাপ আরো তীব্র হচ্ছে।

রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যেও উৎপাদন কমেছে

ফুয়েল অয়েলের সরবরাহ সংকটের পেছনে রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিশোধনাগারগুলোর জটিলতাও বড় ভূমিকা রাখছে। ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার বিভিন্ন পরিশোধনাগারের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। এতে দেশটির ফুয়েল অয়েল রফতানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে রাশিয়ার ফুয়েল অয়েল রফতানি দৈনিক ৫ লাখ ৯১ হাজার ব্যারেলে নেমেছে। ২০২৫ সালে দেশটির গড় রফতানি ছিল দৈনিক ৮ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেলের বেশি। ২০১৭ সাল থেকে পাওয়া তথ্যের মধ্যে আগস্টের রফতানি ছিল সর্বনিম্ন।

মধ্যপ্রাচ্য থেকেও ফুয়েল অয়েলের রফতানি কমেছে। মার্চ-আগস্ট সময়ে অঞ্চলটির ফুয়েল অয়েল রফতানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৫ শতাংশ কমে দৈনিক গড়ে ৪ লাখ ৪৭ হাজার ব্যারেলে নেমেছে।

কুয়েতের আল-জোর পরিশোধনাগারও এ সংকটের উদাহরণ। এটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বড় ফুয়েল অয়েল রফতানিকারক। তবে মার্চের পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি মাত্র একটি চালান রফতানি করেছে। সেটির পরিমাণ ছিল দৈনিক ২৬ হাজার ব্যারেলের সমপরিমাণ। অন্যদিকে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানটি দৈনিক প্রায় ১ লাখ ৯১ হাজার ব্যারেল ফুয়েল অয়েল রফতানি করেছিল।

আরও