রয়টার্সের বিশ্লেষণ

নিত্যপণ্য ও বাড়ি কেনায় জ্বালানি তেলের চড়া দামের প্রভাব

জ্বালানির বাজারে সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি হয়েছে ডিজেলের দামে। ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে পরিশোধিত এ জ্বালানির দাম রেকর্ড পর্যায়ে উঠেছে।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ পরিবারের দৈনন্দিন খরচও বাড়ছে। পরিবহন ও ঘর উষ্ণ রাখার খরচ বাড়ার পাশাপাশি এর প্রভাব পড়ছে খাদ্যপণ্য, পোশাক ও প্যাকেজিংয়ের দামেও। মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়ছে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে। এর প্রভাব পড়ছে বাড়ি কেনার ঋণসহ বিভিন্ন ধরনের লোনের খরচেও। খবর রয়টার্স

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম পাঁচ মাসের মধ্যে ব্যারেলপ্রতি সর্বোচ্চ ১১০ ডলারে পৌঁছেছে। এশিয়া ও ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও ২০২২ সালের ডিসেম্বরের পর সর্বোচ্চে উঠেছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়ায়। পাশাপাশি শিল্প-কারখানায় পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের ব্যয়ও বেড়ে যায় শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে ভোক্তাদের ওপর।

জ্বালানির বাজারে সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি হয়েছে ডিজেলের দামে। ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে পরিশোধিত এ জ্বালানির দাম রেকর্ড পর্যায়ে উঠেছে। চলতি মাসে যুক্তরাজ্যে প্রথমবারের মতো প্রতি লিটার ডিজেলের গড় খুচরা দাম ২ পাউন্ডে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রেও গত সেপ্টেম্বরে প্রতি গ্যালন ডিজেলের দাম রেকর্ড ৬ ডলার ৫৩ সেন্টে উঠেছিল।

এদিকে জ্বালানির বাড়তি দামের প্রভাব কমাতে পদক্ষেপ নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সাধারণত জনসড়কে চলাচল করে না এমন যন্ত্রপাতি ও যানবাহনে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত লাল রঙ মেশানো ডিজেল এখন যে কেউ কিনতে পারবেন। এছাড়া এ জ্বালানিতে করও দিতে হয় না।

মূল্যস্ফীতির চাপে বাড়ছে ঋণের খরচ

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শুধু পরিবহন ও নিত্যপণ্যের ব্যয় বাড়ায় না, এর প্রভাব পড়ে সুদের হারেও। তেল-গ্যাসের দাম বাড়লে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ে। এতে পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে বাড়ি কেনা কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনে ঋণ নেয়ার খরচও বেড়ে যায়।

যুক্তরাজ্যে মূল্যস্ফীতি ও ঋণের খরচ ধারণার চেয়ে বেশি বেড়েছে গত আগস্টে। দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পেট্রল ও ডিজেলের দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতি ২০২৫ সালের অক্টোবরের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

অস্ট্রেলিয়ায়ও সুদহার বেড়েছে। গত মাসে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক নগদ সুদহার বাড়িয়ে ১৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যায়। এর প্রভাব পড়েছে দেশটির আবাসন ঋণে। অস্ট্রেলিয়ায় অধিকাংশ গৃহঋণের সুদহার পরিবর্তনশীল হওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদহার বাড়ার সঙ্গে ঋণের কিস্তিও বেড়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রেও বাড়ি কেনার জন্য ঋণ নেয়ার প্রবণতা দুর্বল হয়েছে। দেশটিতে ৩০ বছর মেয়াদি গৃহঋণের সুদহার প্রায় ৬ দশমিক ১ থেকে বেড়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে। এতে সম্ভাব্য ক্রেতাদের ঋণ নেয়ার খরচ বেড়েছে।

বাড়ছে ঘর গরম রাখা ও প্যাকেজিংয়ের ব্যয়

শীতপ্রধান অঞ্চলে ঘর উষ্ণ রাখার খরচও বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে গত বছরের তুলনায় এবার শীতের জ্বালানি বিল ৪৭ শতাংশ বাড়তে পারে। ন্যাশনাল এনার্জি অ্যাসিস্ট্যান্স ডিরেক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য থেকে এ পূর্বাভাস পাওয়া গেছে।

যুক্তরাজ্যে ঘর গরম রাখার প্রধান জ্বালানি প্রাকৃতিক গ্যাস। দেশটির জ্বালানি খাতের সংগঠন এনার্জি ইউকে ধারণা করছে, চলতি প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) পরিবারপ্রতি গ্যাস বিল গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ শতাংশ বাড়তে পারে।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির আরেকটি প্রভাব পড়ছে প্লাস্টিক ও পোশাক শিল্পে। প্লাস্টিক তৈরির প্রধান কাঁচামাল অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস। এসব কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত করে বোতল, জুতা ও বিভিন্ন ধরনের প্যাকেজিং উপকরণ তৈরি করা হয়। পোশাক শিল্পে ব্যবহৃত পলিয়েস্টার কাপড় তৈরিতেও জীবাশ্ম জ্বালানির উপাদান লাগে। ফলে তেল-গ্যাসের দাম বাড়লে এসব পণ্য উৎপাদনের খরচও বাড়ে।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এমএটির তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ মুদি পণ্যের ক্ষেত্রে প্লাস্টিক, কাগজ কিংবা কাচের প্যাকেজিংয়ের ব্যয় সাধারণত পণ্য উৎপাদনের মোট খরচের ৫-১৫ শতাংশ। তাই প্যাকেজিংয়ের খরচ বাড়লে পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ে। এ বাড়তি খরচের কিছু অংশ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের বহন করতে হয়। তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে গত আগস্টে প্লাস্টিকের দাম ২০২৫ সালের অক্টোবরের তুলনায় ৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সময় দেশটিতে সেপ্টেম্বরে ভোক্তা মূল্যস্ফীতির গতিও বেড়েছে।

আরও