দেশের পোশাক খাতের সব শ্রমিককে সর্বজনীন পেনশন স্কিমে দ্রুত অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি তাদের পেনশনের বয়সসীমা ৬০ থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। একই সঙ্গে স্কিমটিকে শ্রমিকদের কাছে আরো আকর্ষণীয় করতে প্রথম দুই বছরের জন্য বিশেষ সরকারি প্রণোদনা দেয়ার দাবি তুলেছে সংগঠনটি।
রাজধানীর বিজিএমইএ কমপ্লেক্সের নুরুল কাদের অডিটোরিয়ামে গতকাল ‘সর্বজনীন পেনশন স্কিমবিষয়ক আলোচনা সভা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এ প্রস্তাব দেন সংগঠনের সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের (এনপিএ) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান। বিশেষ অতিথি ছিলেন এনপিএ সদস্য শেখ কামরুল হাসান।
সভায় বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, ‘পোশাক খাতের সব শ্রমিককে দ্রুত সর্বজনীন পেনশন স্কিমের আওতায় আনতে উদ্যোগ নিতে হবে। এটি সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখবে।’
মাহমুদ হাসান খানের মতে, প্রথম দুই বছরের জন্য বিশেষ সরকারি প্রণোদনা এবং পোশাক শ্রমিকদের পেনশনের বয়সসীমা ৬০-এর পরিবর্তে ৫৫ বছর নির্ধারণ করা হলে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ স্কিমে যুক্ত হতে আরো আগ্রহী হবেন।
সভাপতির বক্তব্যে এনপিএ নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান বলেন, ‘দেশের মানুষের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই সরকার সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করেছে। এটি বার্ধক্যে নাগরিকদের আর্থিক সুরক্ষার বড় অবলম্বন হয়ে উঠবে। ১৮-৫০ বছর বয়সী নাগরিকরা ব্যাংকের মাধ্যমে এ স্কিমে চাঁদা দিতে পারবেন এবং ৬০ বছর পূর্ণ হলে জমাকৃত অর্থ পেনশন হিসেবে পাবেন। কোনো গ্রাহক ৬০ বছর বয়সের আগে মারা গেলে তার মনোনীত ব্যক্তি জমাকৃত অর্থ মুনাফাসহ পাবেন। আয়জনিত সমস্যায় নিয়মিত চাঁদা দিতে অসুবিধা হলে চাঁদার পরিমাণ কম-বেশি করার সুযোগও রয়েছে।’
ড. সুরাতুজ্জামান জানান, স্কিমে জমাকৃত অর্থ গ্রাহকদের যথাসময়ে ফেরত দেয়া হবে এবং ষাটোর্ধ্ব বয়সে উন্নত জীবন ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে। এছাড়া পেনশন স্কিমের কার্যক্রম আরো গতিশীল ও শক্তিশালী করতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
এনপিএর নির্বাহী চেয়ারম্যান আরো জানান, বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০২৬-এর সর্বশেষ সংশোধনীতে ১০০ জনের বেশি শ্রমিক রয়েছে এমন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের সর্বজনীন পেনশন স্কিমে অন্তর্ভুক্তির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য হিসাব খোলার উদ্যোগ নিতে হবে।
পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তা ও শ্রমিকদের এ স্কিমে সম্পৃক্ত করতে বিজিএমইএকে অগ্রণী ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি পরিবার থেকে অন্তত একজনকে সর্বজনীন পেনশনের আওতায় আনা প্রয়োজন।’
সভায় স্বাগত বক্তব্যে এনপিএ সদস্য শেখ কামরুল হাসান জানান, দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বৃদ্ধ বয়সে আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই উন্নত দেশের মতো বাংলাদেশেও সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু করা হয়েছে।
সভায় বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান বলেন, ‘তৈরি পোশাক খাতের প্রায় ৫০ লাখ শ্রমিককে এ স্কিমে অন্তর্ভুক্ত করা এবং পরবর্তী সময়ে এর ধারাবাহিক ব্যবস্থাপনা বজায় রাখা কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হবে।’ তবে এ উদ্যোগ সময়োপযোগী, যুগান্তকারী ও প্রশংসনীয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিজিএমইএর সহসভাপতি মো. রেজোয়ান সেলিম বলেন, ‘সর্বজনীন পেনশন স্কিমের আকর্ষণীয় ‘রেট অব রিটার্ন’ বা মুনাফার হার শ্রমিকদের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষায় অনন্য ভূমিকা রাখতে পারে। তাই পোশাক খাতের সব শ্রমিককে স্কিমের আওতায় আনতে বিজিএমইএ সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করবে।’
সভায় অংশগ্রহণকারীরা স্কিম নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন ও সংশয় তুলে ধরলে এনপিএর নির্বাহী চেয়ারম্যান বিস্তারিত ব্যাখ্যার মাধ্যমে তাদের আশ্বস্ত করেন। অনুষ্ঠানে বিজিএমইএর সদস্য, পোশাক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক, কর্মকর্তা ও শ্রমিক প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা অংশ নেন।