ডব্লিউজিসির জরিপ

রিজার্ভে স্বর্ণের মজুদ বাড়াতে চায় ৮৯% কেন্দ্রীয় ব্যাংক

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণের মজুদ বা রিজার্ভ আরো বাড়াতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে।

মূলত আন্তর্জাতিক সঞ্চয় বা রিজার্ভে বৈচিত্র্য আনতে চায় ব্যাংকগুলো। সেই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা সামাল দিতে এ পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের (ডব্লিউজিসি) সাম্প্রতিক এক বৈশ্বিক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। খবর আনাদোলু এজেন্সি।

সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, জরিপে অংশ নেয়া প্রায় ৮৯ শতাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ ব্যবস্থাপক মনে করেন, আগামী ১২ মাসে বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোয় স্বর্ণের মজুদ আরো বাড়বে। আন্তর্জাতিক বাজারে কৌশলগত আপৎকালীন সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা বজায় রয়েছে। বৈশ্বিক এ জরিপের ফলাফলেও বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

ডব্লিউজিসির সর্বশেষ বার্ষিক জরিপে দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারী রিজার্ভ ব্যবস্থাপকদের মধ্যে ৪৫ শতাংশই নিজেদের ব্যাংকে এক বছরের মধ্যে স্বর্ণের মজুদ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন। ডব্লিউজিসি ৯ বছর ধরে এ ধরনের বার্ষিক জরিপ পরিচালনা করে আসছে। তবে এবারই স্বর্ণ কেনার ইচ্ছা বা আগ্রহের হার জরিপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিপরীতে মাত্র ১ শতাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, আগামী এক বছরে তারা স্বর্ণের মজুদ কিছুটা কমানোর কথা ভাবছে। বাকি ব্যাংকগুলো বর্তমান মজুদ অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে মতামত দিয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিকোণ থেকেও স্বর্ণের প্রতি আন্তর্জাতিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ঝোঁক স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জরিপে অংশগ্রহণকারী প্রায় ৮৩ শতাংশ কর্মকর্তা পূর্বাভাস দিয়েছেন, পাঁচ বছরে বৈশ্বিক মোট রিজার্ভে স্বর্ণের অনুপাত আরো বাড়বে। আগের বছরের জরিপে এ হার ছিল ৭৬ শতাংশ। এছাড়া জরিপে অংশ নেয়া ৯৩ শতাংশ ব্যাংক কর্মকর্তা নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক রিজার্ভে স্বর্ণ রাখার কথা নিশ্চিত করেছেন। গত বছরের জরিপে এ হার ছিল ৮১ শতাংশ।

অন্যদিকে ঐতিহ্যবাহী বিদেশী মুদ্রা—বিশেষ করে মার্কিন ডলারের ওপর বিশ্বজুড়ে ব্যাংকারদের আস্থার জায়গা কিছুটা কমেছে। জরিপে অংশ নেয়া প্রায় ৭৪ শতাংশ কর্মকর্তা মনে করেন, পাঁচ বছরের মধ্যে বৈশ্বিক রিজার্ভে ডলারের পরিমাণ অনেকটাই কমে আসবে। যদিও স্বর্ণ রাতারাতি ডলারের স্থান পুরোপুরি দখল করতে পারবে না, তবু ঝুঁকি কমাতে রিজার্ভের সম্পদকে বিভিন্ন নিরাপদ খাতে ছড়িয়ে দেয়ার কৌশল অবলম্বন করছে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তাদের স্বর্ণকে প্রাধান্য দেয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি প্রধান কারণ উঠে এসেছে। এর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মকর্তা অর্থনৈতিক বা আর্থিক সংকটকালে স্বর্ণের শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য পারফরম্যান্সকে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া ৮৪ শতাংশ কর্মকর্তা স্বর্ণকে দীর্ঘমেয়াদে সম্পদের মান ও মূল্য ধরে রাখার উৎকৃষ্ট মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ৮২ শতাংশ কর্মকর্তা সার্বিক বিনিয়োগে ঝুঁকি কমানোর উপায় বা বৈচিত্র্য আনার মাধ্যম হিসেবে এর ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে বিকাশমান বা উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা থেকে নিজেদের জাতীয় সম্পদকে সুরক্ষা দিতে স্বর্ণকে একটি নির্ভরযোগ্য হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করছে।

জরিপের ফলাফলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা উঠে এসেছে। নিজস্ব ভৌত স্বর্ণ কোথায় এবং কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, সে বিষয়ে ব্যাংকগুলো এখন সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে। গত এক বছরে জরিপে অংশ নেয়া ব্যাংকগুলোর মধ্যে ৯ শতাংশ নিজ দেশে স্বর্ণ রাখার ধারণক্ষমতা বা ক্যাপাসিটি বাড়িয়েছে। আর ১০ শতাংশ ব্যাংক বিদেশে রাখা স্বর্ণের অবস্থান বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দিয়েছে। তবে এসব পরিবর্তন সত্ত্বেও ব্যাংক অব ইংল্যান্ড বিদেশে স্বর্ণ রাখার জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় কেন্দ্র হিসেবে শীর্ষে রয়েছে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫৭ শতাংশ ব্যাংকের প্রথম পছন্দ এটি। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ ভল্ট বা সংরক্ষণাগার, যেখানে ৪৯ শতাংশ ব্যাংক তাদের স্বর্ণের মজুদ রাখছে।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের (চীন ব্যতীত) প্রধান এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈশ্বিক বিভাগের প্রধান শাওকাই ফ্যান বিশ্লেষণ করে জানান, অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলোই মূলত সরকারের এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় ভূমিকা রাখছে। তিনি উল্লেখ করেন, রিজার্ভ ব্যবস্থাপকরা নীতিনির্ধারণের সময় মূলনীতি সুদের হার, বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং টানা মূল্যস্ফীতির বিষয়গুলোকে বিশেষভাবে বিবেচনায় নিচ্ছেন।

তিনি আরো বলেন, ‘স্বর্ণকে তারা এখন ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবেলার একটি কার্যকর পথ এবং রিজার্ভে ভারসাম্য আনার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন। গত চার বছরে বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো গড়ে প্রতি বছর এক হাজার টনেরও বেশি স্বর্ণ কিনেছে। এটি আগের এক দশকের গড় ক্রয়ের তুলনায় অনেক বেশি।’ অনিশ্চিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে রিজার্ভের সুরক্ষায় কৌশলগত সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের প্রয়োজনীয়তা আগামী দিনেও বাজারে স্বর্ণের চাহিদা বাড়িয়ে রাখবে বলে তিনি অভিমত দেন।

আরও