এমএসএমই দিবসের অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী

নতুন উদ্যোক্তা তৈরির হার কমে যাওয়ায় বেড়েছে আয়বৈষম্য

দেশে বিগত ১২-১৫ বছরে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় আয়বৈষম্য বেড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

তিনি বলেন, ‘বিগত বছরগুলোয় নতুন উদ্যোক্তা খুব কম তৈরি হয়েছে। যারা আগে থেকেই শিল্প-কারখানার মালিক ছিলেন, মূলত তারাই আরো বড় হয়েছেন।’ রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) মিলনায়তনে গতকাল আন্তর্জাতিক এমএসএমই দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দেশে যে হারে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী ১০ থেকে ১৫ বছরে সেই অনুপাত ব্যাপক হারে কমে এসেছে। ফলে অর্থনৈতিক প্রবাহ নির্দিষ্ট কিছু হাতে সীমাবদ্ধ থেকেছে। এটি আয়বৈষম্য বাড়ার একটি প্রধান রেসিপি এবং আমরা সেটিই অনুসরণ করেছি। যার ফলে ১৫-২০ বছর আগের তুলনায় বর্তমানে আয়বৈষম্য অনেক বেড়েছে।’

আয়বৈষম্যের বৈশ্বিক সূচকের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘ইনকাম ডিসপারিটি বা আয়বৈষম্যের স্কেল শূন্য থেকে ১ পর্যন্ত। সূচক যত ওপরের দিকে যায়, বৈষম্য তত বাড়ে। আমাদের এখানে এ বৈষম্য এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি।’

প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, ‘ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া এমনকি ভারত-পাকিস্তানের জিডিপিতে এমএসএমই (অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প) খাতের অবদান আমাদের চেয়ে অনেক বেশি। আমাদের জিডিপিতে এ খাতের অবদান মাত্র ২৫ শতাংশ। আমরা এটাকে আরো বাড়াতে চাই। কারণ অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহ গতিশীল রাখতে এমএসএমই খাতকে শক্তিশালী করার বিকল্প নেই।’

নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা একটি ব্রড-বেজড বা ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছি। নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম চালু করা হচ্ছে। বিসিকের মাধ্যমে পাবনা, সিলেট ও নীলফামারীর সৈয়দপুরে নতুন শিল্প পার্ক স্থাপনের প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এছাড়া যেসব শিল্প পার্কে প্লট শেষ হয়ে গেছে, সেখানে নতুন করে ফিজিবিলিটি স্টাডি করে আরো পার্ক করা হবে।’

গ্যাস সংকট ও শিল্পায়ন প্রসঙ্গে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘ভবিষ্যতে আমরা কম জ্বালানি খরচ করা শিল্পের দিকে বেশি নজর দেব। আর বর্তমানে যেসব কল-কারখানা গ্যাস সংকটে ভুগছে, সেগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করছি।’

অনুষ্ঠানে উইমেন অন্ট্রাপ্রেনিউরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি নাসরীন ফাতেমা আউয়াল বলেন, ‘দেশের প্রায় এক কোটি পুরুষ উদ্যোক্তার বিপরীতে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা মাত্র প্রায় সাত লাখ। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে কর্মসংস্থান বাড়ে, পারিবারিক আয় বৃদ্ধি পায়, শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য উন্নত হয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়।’

অনুষ্ঠানে এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী জানান, প্রতিষ্ঠার পর থেকে এসএমই ফাউন্ডেশন ২২ লক্ষাধিক উদ্যোক্তাকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সেবা দিয়েছে, যাদের মধ্যে আড়াই লক্ষাধিক সরাসরি সুবিধাভোগী উদ্যোক্তা এবং ৬০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা। এসএমই ফাউন্ডেশন ২০০৯ সাল থেকে ক্রেডিট হোলসেলিং কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ১৫ হাজার উদ্যোক্তার মাঝে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বিতরণ করেছে, যাদের অন্তত ২৫ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা।

তিনি বলেন, ‘এসএমই ফাউন্ডেশন সারা দেশে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, উদ্যোক্তাদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানো এবং ব্যবসাকে প্রযুক্তি ও আইসিটি-বান্ধব করে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে। এছাড়া উদ্যোক্তাদের পণ্যের বিক্রয় ও বাজারজাত, প্রচারণা, নীতিগত সহায়তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের সঙ্গে অ্যাডভোকেসি করছে। তবে আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে সারা দেশে ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা যাচ্ছে না।’ এর পরিপ্রেক্ষিতে এসএমই ফাউন্ডেশনের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে সরকারের সহায়তা কামনা করেন তিনি।

শিল্প সচিব আব্দুন নাসের খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), বাংলাদেশের প্রধান ম্যাক্স টুনন। অনুষ্ঠানে দুটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এসএমই ফাউন্ডেশনের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজিম আহমেদ সাত্তার ও বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফেরদৌস আরা বেগম।

আরও