নিরীক্ষকের মতামত

নির্ধারিত সময়ে বীমা দাবি পরিশোধে ব্যর্থ কন্টিনেন্টাল ও দেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স

বীমা আইন অনুসারে, জরিপকারীর প্রতিবেদন পাওয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে বীমা দাবির অর্থ পরিশোধের নিয়ম রয়েছে।

তবে আইনানুসারে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গ্রাহকদের পাওনা নিষ্পত্তিতে ব্যর্থ হয়েছে তালিকাভুক্ত দুই বীমা প্রতিষ্ঠান কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্স পিএলসি ও দেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড। কোম্পানি দুটির সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৫ হিসাব বছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এ বিষয়ে মতামত দিয়েছেন নিরীক্ষক। গতকাল স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটে নিরীক্ষকের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। মতামতে কোম্পানি দুটির বেশকিছু ব্যত্যয় ও ঘাটতির বিষয়টিও তুলে ধরেছেন নিরীক্ষক।

নিরীক্ষকের মতামত অনুসারে, কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্স একটি পূর্ণাঙ্গ স্থায়ী সম্পদ রেজিস্টার বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে, যেখানে সম্পদের বিবরণ, পরিচিতি নম্বর, অবস্থান, পরিমাণ, মূল্য, পুঞ্জীভূত অবচয় ও অবশিষ্ট মূল্য থাকার কথা ছিল। স্থায়ী সম্পদগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করা হয়নি। ফলে এর ভৌত যাচাইকরণ ও হিসাবের খাতার সঙ্গে সঠিকভাবে মেলানো যায়নি। ফলে নিরীক্ষক আর্থিক বিবরণীতে প্রদর্শিত সম্পত্তি, প্লান্ট ও ইকুইপমেন্টের অস্তিত্ব, সম্পূর্ণতা, মালিকানা ও মূল্যায়ন যাচাই করতে পারেননি। কোম্পানিটির কিছু বীমা দাবির দায় বীমা আইন, ২০১০-এর ৭২ ধারা অনুযায়ী নির্ধারিত ৯০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করা হয়নি বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষক।

আইন অনুযায়ী, শ্রমিকদের মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিল (ডব্লিউপিপিএফ) গঠন করেনি কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্স এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি রাখেনি। কোম্পানিটির প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি ফান্ড দুই বছর ধরে অডিট করা হয়নি, যা বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর পরিপন্থী। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসি ও এক্সিম ব্যাংক লিমিটেডে কোম্পানিটির উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এফডিআর রাখা আছে। ব্যাংক রেজল্যুশন অর্ডিন্যান্স, ২০২৫-এর অধীনে এ ব্যাংকগুলোকে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’-তে একীভূত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রণীত রেজল্যুশন স্কিম অনুযায়ী এফডিআরের টাকা উত্তোলনে কঠোর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এফডিআর মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা উত্তোলন করা যাবে। অবশিষ্ট টাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়ন হবে এবং পর্যায়ক্রমিক প্রত্যাহার সূচির আওতাভুক্ত থাকবে। নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য মুনাফার হার কমিয়ে ৪ শতাংশ করা হয়েছে, যা আমানতের মূল শর্তের বিচ্যুতি। এটি কোম্পানির বড় বিনিয়োগের টাকা ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন নিরীক্ষক।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক জারীকৃত ২০১৮ সালের বিধিমালা অনুযায়ী নন-লাইফ বীমা ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের যে সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল দেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স সেটি লঙ্ঘন করেছে বলে মত দিয়েছেন নিরীক্ষক। এতে নির্ধারিত সীমার চেয়ে ৫ কোটি ২৭ লাখ ৫০ হাজার ৯৭০ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। কোম্পানিটির আর্থিক বিবরণীতে নোট-২৮-এর অধীনে সাধারণ বীমা করপোরেশনের কাছে ৩৫ কোটি ৬৬ লাখ ৯০ হাজার ১৬০ টাকা অনাদায়ী পাওনা হিসেবে দেখানো হয়েছে। কোনো প্রকার উল্লেখযোগ্য আদায় বা আনুষ্ঠানিক সমন্বয় ছাড়াই এ ব্যালান্স বছরের পর বছর ধরে টানা হচ্ছে। তাছাড়া এ দীর্ঘদিনের বকেয়া টাকা আদায়ের সপক্ষে কোম্পানি কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নিরীক্ষককে দেখাতে পারেনি।

কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্সের মতোই দেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স বীমা আইন, ২০১০-এর ৭২ ধারা অনুযায়ী জরিপকারীর প্রতিবেদন জমার ৯০ দিনের মধ্যে বীমা দাবি নিষ্পত্তি করতে ব্যর্থ হয়েছে। আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, কোম্পানিটির আনুমানিক বকেয়া বীমা দাবির পরিমাণ ১১ কোটি ৪০ লাখ ২৭ হাজার ৮৪৩ টাকা। কোম্পানিটি ২০২৫ সালের জন্য ডব্লিউপিপিএফের প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি আর্থিক বিবরণীতে রাখলেও বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী তা শ্রমিকদের মাঝে বণ্টন করেনি। এ বিধিবদ্ধ নিয়ম না মানার কারণে জরিমানা বা আইনি দায় তৈরি হতে পারে, যা আর্থিক বিবরণীতে বিবেচনা করা হয়নি বলে মত দিয়েছেন নিরীক্ষক।

আরও