অর্থায়ন জটিলতায় পিপিপি প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রিতা

প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা সংস্কারের দাবি কর্তৃপক্ষের

প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় এসে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বা পিপিপি মডেল তৈরি করে বর্তমান সরকার। দেশজুড়ে যা বেশ সাড়া ফেলে দেয়। কিন্তু গত এক যুগে পিপিপি প্রকল্প থেকে কাঙ্ক্ষিত সাড়া মেলেনি।

প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় এসে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বা পিপিপি মডেল তৈরি করে বর্তমান সরকার। দেশজুড়ে যা বেশ সাড়া ফেলে দেয়। কিন্তু গত এক যুগে পিপিপি প্রকল্প থেকে কাঙ্ক্ষিত সাড়া মেলেনি। প্রকল্পে অর্থায়ন-সংক্রান্ত জটিলতা এর অন্যতম প্রধান কারণ বলে মনে করছে পিপিপি কর্তৃপক্ষ। তারা বলছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু দেশের প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার কারণে অর্থায়ন প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে দেখা দেয় দীর্ঘসূত্রিতা। এজন্য ব্যাংকিং খাতের সংস্কার প্রয়োজন। পাশাপাশি পিপিপি প্রকল্পে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে বন্ড মার্কেট, পেনশন ফান্ড ইন্স্যুরেন্স ফান্ড থেকে দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

জানা গেছে, ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে এখন পর্যন্ত ঢাকা চট্টগ্রামে মাত্র দুটি হাসপাতাল পিপিপির আওতায় বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। পিপিপি কর্তৃপক্ষ আরো ৭৭টি প্রকল্পকে ব্যবস্থায় বাস্তবায়নের জন্য তালিকাভুক্ত করেছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ২৮ বিলিয়ন ডলার বা লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার কারণে এসব প্রকল্পে অর্থায়ন জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এজন্য সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলামের কাছে -সংক্রান্ত একটি পর্যবেক্ষণমূলক চিঠি পাঠিয়েছে পিপিপি কর্তৃপক্ষ।

কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সুলতানা আফরোজ স্বাক্ষরিত চিঠিতে পিপিপি প্রকল্পগুলোয় প্রজেক্ট ফাইন্যান্সিং বা প্রকল্প অর্থায়ন পদ্ধতিতে ঋণ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এজন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে ব্যাংক ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। তবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।    

পিপিপি প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন না হওয়ার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেই পিপিপি কর্তৃপক্ষ চিঠি দিয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্তৃপক্ষের সিইও সুলতানা আফরোজ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে অর্থায়নের অভাবে প্রকল্পগুলোয় দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিয়েছে। অর্থায়ন সমস্যার কারণেই পিপিপি প্রকল্পগুলো এতদিন এগোতে পারেনি। সমস্যা কটিয়ে উঠতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিবকে চিঠি দেয়া হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবেই সচিবের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি (আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সচিব) অর্থায়ন ত্বরান্বিত করার বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন বলে আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। সব মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পের ৩০ শতাংশ পিপিপিতে বাস্তবায়নের নির্দেশনা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, এটি বাস্তবায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব সংশ্লিষ্টদের নিয়মিত বৈঠক করছি। আশা করছি শিগগির পিপিপি প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আসবে। 

কর্তৃপক্ষ বলছে, পিপিপি প্রকল্পগুলো বেসরকারি উদ্যোক্তা দিয়ে বাস্তবায়িত হয়। প্রকল্প কোম্পানির মূলধন হচ্ছে প্রকল্প পরিচালনাকারী বেসরকারি কোম্পানির নিজস্ব ইকুইটি বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যেমন বাণিজ্যিক ব্যাংক, বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংক, আর্থিক সংস্থার মতো প্রাতিষ্ঠানিক তহবিল। রয়েছে পেনশন তহবিল ইন্স্যুরেন্স তহবিল থেকে ঋণ। পিপিপি প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের মধ্যে প্রকল্পভেদে ঋণ ইকুইটির অনুপাত ৭০:৩০ থেকে ৮০:২০-এর মধ্যে হয়ে থাকে। অর্থাৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে গৃহীত ঋণ ইকুইটির চেয়ে বেশি থাকে।

এছাড়া ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রকল্প অর্থায়ন পদ্ধতি হচ্ছে একটি প্রচলিত পদ্ধতি। পদ্ধতিতে অর্থায়ন করলে ব্যাংক তাদের ঋণের বিপরীতে প্রকল্প কোম্পানির কিংবা প্রকল্প পরিচালকদের ব্যক্তিগত সম্পদের জামানত নিতে পারে না। এছাড়া প্রকল্পের চুক্তি স্বাক্ষরের পর বেসরকারি অংশীদাররা প্রকল্প কোম্পানি বা প্রকল্পের নামে যে একটি বিশেষ কোম্পানি গঠন করে, ওই কোম্পানির পক্ষে ঋণ গ্রহণে জামানত দেয়ার সক্ষমতা থাকে না। কেননা প্রকল্পের জমি সরকারের মালিকানায় থাকে। তাই জমি জামানত হিসেবে দেয়ার সুযোগ নেই।

প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে আরো বেশকিছু সমস্যার কথাও উল্লেখ করেছে পিপিপি কর্তৃপক্ষ। তারা বলছে, ঋণের বিপরীতে জামানত একটি সর্বজনীন বিষয়। তবে এটি আইন দ্বারা বদ্ধ নয়। কিন্তু দেশীয় ব্যাংকগুলো জামানত ব্যতীত ঋণ দিতে অভ্যস্ত নয়। সেজন্য ব্যাংকগুলো প্রজেক্ট ফাইন্যান্স পদ্ধতিতে ক্যাশ ফ্লোর ওপরে নির্ভর করে ঋণ দিতে অসম্মতি জানায়। পিপিপি প্রকল্পে সরকারি জমি জামানত হিসেবে যে বন্ধক রাখা সম্ভব নয়, এক্ষেত্রে ব্যাংকাররা বিষয়টি মানতে চান না। আবার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঋণের বিপরীতে শেয়ারহোল্ডারদের ব্যক্তিগত সম্পদের গ্যারান্টি চাওয়া হয়, যা প্রচলিত প্রকল্প অর্থায়নের সঙ্গে অমিল। ফলে প্রকল্প কোম্পানির ঋণ নেয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

এদিকে ব্যাংকগুলো ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ধারা ২৬()() ২০১৬ সালের ১০ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডির প্রজ্ঞাপন অনুসরণ করে। বিধিগুলো কোনো প্রকল্পের জন্য মোট মূলধন ব্যয়ের সর্বাধিক ৩৫ শতাংশ ঋণ দিতে পারে ব্যাংক। তবে পিপিপি প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তাই আইনগত দিক দেখলে এটি সুস্পষ্ট, বেশির ভাগ তফসিলি ব্যাংক এককভাবে অর্থায়নে সক্ষম নয়। আবার স্থানীয় ব্যাংকগুলোকে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গাইডলাইন অনুসরণ করতে হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিআরপিডির ২০১২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বরের প্রজ্ঞাপন অনুসারে জামানতবিহীন ঋণের ক্ষেত্রে সঞ্চিতি অনেক বেশি। যে কারণে জামানতবিহীন ঋণ  দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর অনাগ্রহের অন্যতম কারণ।

এসব প্রতিবন্ধকতা উত্তরণে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশও করেছে কর্তৃপক্ষ। এর অংশ হিসেবে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ধারা ২৬-এর ()() বিআরপিডির ২০১৬ সালের ১০ মে এবং ২০১২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বরের প্রজ্ঞাপন সংশোধন করার কথা বলা হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে পিপিপি প্রকল্পে যেকোনো পরিমাণ এমনকি পুরো প্রকল্প ঋণ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া পিপিপি প্রকল্পগুলোয় ব্যাংকের অংশগ্রহণের জন্য পৃথক বিধিবিধান নির্দেশিকা প্রবর্তন করা যেতে পারে বলেও মনে করে কর্তৃপক্ষ।

তবে ধরনের প্রকল্পে বাণিজ্যিক ব্যাংকের অর্থায়ন করতে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সরকারকে বসতে হবে বলে মনে করেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিডেটের এমডি সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সাধারণত স্বল্পমেয়াদে অর্থায়ন করে। আর পিপিপি প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হয় দীর্ঘমেয়াদে। এজন্য এক্ষেত্রে অর্থায়ন করার তেমন সুযোগ থাকে না। তবে এসব প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সরকারকে বসতে হবে। আলোচনার পর কী উপায়ে বিনিয়োগ করা যায়, সে বিষয়ে বাস্তবায়নসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।

আরও