সাক্ষাৎকার

দেশে অর্জিত যেকোনো কাজের দক্ষতা বিদেশে স্বীকৃতি পাবে

আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে কাজ করছে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ)।

আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে কাজ করছে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ)। দেশে অর্জিত দক্ষতার সনদ বিদেশেও গ্রহণযোগ্য করতে কাজ করছে সংস্থাটি। সারা দেশে দক্ষতা উন্নয়নে রেগুলেটরি বডির দায়িত্ব পালন ও দক্ষতার স্বীকৃতিও দিচ্ছে এনএসডিএ। সংস্থার নির্বাহী চেয়ারম্যান নাসরীন আফরোজ নিজেদের কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তোফাজ্জল হোসেন

জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের যাত্রা কীভাবে কী উদ্দেশ্য নিয়ে?

মূলত জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১৮ প্রণয়নের মাধ্যমে এটি গঠিত হয় এবং ২০১৯ থেকে কার্যক্রম শুরু হয়। এর পরই আসলে কভিড-১৯ মহামারী শুরু হওয়ায় প্রায় দুই বছর কার্যক্রম ভালোভাবে করা যায়নি। তবে আমি দায়িত্ব গ্রহণের আগে যিনি দায়িত্বে ছিলেন তিনি অনেক আইনকানুনের খসড়া তৈরি করে গেছেন। আর আমি আসার পর যেটা হয়েছে, ২০২২-এর ডিসেম্বরে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি পাস করা হয়। নীতির আলোকে আমরা পাঁচ বছর মেয়াদি একটি কার্য পরিকল্পনা (২০২২ থেকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত) গ্রহণ করি। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ হচ্ছে একটি এপেক্স বডি এবং এটি একটি ছাতার মতো। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংস্থা দক্ষতা উন্নয়নে যে প্রশিক্ষণ প্রদান করে, সেগুলোর একটা মান তৈরি করে দেই আমরা। আমরা মান দেখব, মান ঠিক করে দেব মনিটরিংও করব। এটি প্রধানমন্ত্রীর দূরদৃষ্টি আমি বলব। রকম সংস্থা বিশ্বের বহু দেশে রয়েছে। ফিলিপিন্সে আছে, অস্ট্রেলিয়ায় আছে, ভারতেও আছে। তারা কেন উন্নত হচ্ছে দিন দিন? কারণ শুধু বিদেশে দক্ষ জনশক্তি রফতানির জন্য প্রশিক্ষণ দেয়া হয় তা কিন্তু নয়, দেশের ভেতরেও দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করে সংস্থা। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ দক্ষতার এমন কিছু মান তৈরি করবে যেন একটি বিষয়ে একই রকম কর্মসূচি নিয়ে সারা দেশে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। সেটি শুধু দেশে না দেশের বাইরেও স্বীকৃতি পাবে। আমরা সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।

আপনাদের আগামীর পরিকল্পনাগুলো কী কী?

দক্ষতা উন্নয়ন নীতি অনুযায়ী আমরা কিছু পরিকল্পনা করেছি। তার মধ্যে কিছু স্বল্পমেয়াদি, কিছু মধ্যম মেয়াদি এবং কিছু দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ প্রকল্প রয়েছে। স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পের কাজ মোটামুটি শুরু হয়ে গেছে। মধ্যম মেয়াদি পরিকল্পনারও কিছু কাজ হচ্ছে। আর দীর্ঘমেয়াদি যেটা, যেমন বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মিউচুয়াল রিকগনিশন এগ্রিমেন্ট (এমআরএ) নিয়ে কাজ শুরু করেছি। চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ প্রদানের লক্ষ্যে আমরা অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে কাজ শুরু করেছি, জাইকার (জাপান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা) সঙ্গে বসেছি, ইইউর (ইউরোপীয় ইউনিয়ন) সঙ্গে মিটিং করেছি। ইইউতে আমরা কিছু প্রস্তাব পাঠিয়েছি। সেগুলো প্রক্রিয়াধীন। আমি আশা করি আগামী ২০২৭ সালের মধ্যে ৮৬ লাখ তরুণকে প্রশিক্ষণ দিতে পারব। এটি শুধু যে ফ্রিল্যান্সিং খাতে শুধু তা নয়, আমরা চাচ্ছি কৃষিসহ অন্য খাতগুলোকেও এগিয়ে নিতে। আশা করি আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সবকিছু দৃশ্যমান হবে।

আপনারা এখন পর্যন্ত কোনো দেশের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি করেছেন? যার ফলে বাংলাদেশের কোনো দক্ষতার প্রশিক্ষণ সেই দেশে স্বীকৃতি পেয়েছে?

আমরা সরাসরি কোনো চুক্তি এখনো করিনি। তবে বিষয়টি চলমান রয়েছে। বিএমইটি (জনশক্তি, কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ ব্যুরো) সৌদি আরবের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে। এটি সৌদি সরকারের সঙ্গে না, একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি মাত্র। কারিগরি মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরও কিছু কাজ করছে। ফলে আমরা এখন চাচ্ছি সমন্বয়ের মাধ্যমে একীভূত করে কাজ করতে। তখন আমাদের সরকারের সঙ্গে অন্য দেশের সরকারের চুক্তি হবে। যেটা ভারতের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ কয়েকটি দেশের রয়েছে। ফলে দেখেন তাদের শ্রমিকরা অনেক বেশি রেমিট্যান্স নিয়ে আসছে। তারা শিক্ষিত প্রশিক্ষিত জনবল পাঠাচ্ছে। আমরা সেটি পারছি না। ফলে আমাদের অনেক শ্রমিক বিদেশে যাচ্ছেন কিন্তু সেই তুলনায় রেমিট্যান্স আসছে না।

দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে কিছু মাপকাঠি রয়েছে। আপনারা সেটি কীভাবে নির্ধারণ করছেন?

ন্যাশনাল কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক (বিএনকিউএফ) রয়েছে। দক্ষতার ১০ স্তরে মান নির্ণয় করা হয়। এখানে থেকে পর্যন্ত যে দক্ষতার স্তর রয়েছে সেটি দেখবে এনএসডিএ এবং থেকে ১০ পর্যন্ত অর্থাৎ উচ্চশিক্ষার স্তরটি দেখবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গ্রাফিক ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং, ওয়েব ডিজাইন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, সাইবার সিকিউরিটি, পেইন্টিং, ডোমেস্টিক ওয়ার্ক, ড্রাইভিংয়ের মতো বিষয়ে সিলেবাস তৈরি করেছে। রয়েছে প্রশিক্ষকদের জন্যও কারিকুলাম। একটি পেশার দক্ষতা যাচাইয়ে ছয়টি লেভেল বা স্তর রয়েছে। প্রথম লেভেল অতিক্রম করার জন্য ৩৬০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ নিতে হয়। বাকি পাঁচটি লেভেলের প্রতিটির জন্য ২৭০ ঘণ্টা করে প্রশিক্ষণ নিতে হয়। ছয়টি লেভেলে প্রশিক্ষণ নিলে প্রশিক্ষণার্থীরা ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার বা সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ারের সমান মর্যাদা পাবেন। রাজশাহী টিটিসি (টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার) যেটা সেখানে আমি নিজে গিয়ে দেখে এসেছি। সেখানে কিন্তু জাপানিজ ভাষা শেখানো হয়। বিএমইটির কিছু ট্রেনিং সেন্টার আছে। আমরা ধীরে ধীরে আশা করছি যে আরো কিছু ভাষা, যেমন কোরিয়ান, আরবি বিভিন্ন টিটিসিতে চলছে কিন্তু আমরা চাচ্ছি যে ছড়িয়ে দিতে।

আপনাদের পরিকল্পনায় কি শুধু শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরাই প্রাধান্য পাবে নাকি যাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা উল্লেখ করার মতো নেই তাদের জন্য কোনো ব্যবস্থা থাকছে?

আমাদের পরিকল্পনায় যে শুধু শিক্ষিতরাই থাকছে তা কিন্তু না। আমরা চাই যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে আছেন বা উল্লেখ করার মতো নেই, তাদেরও প্রশিক্ষণ দিতে। কারণ অনেকেই নিজ উদ্যোগে অনেক ভালো ভালো কাজ করছেন, নিজ উদ্যোগে কাজ শিখছেন। দেখা যাচ্ছে তারা সেভাবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত নন। তাদেরও আমাদের সম্পদ হিসেবেই আমরা বিবেচনা করি। অনেক সময় দেখা যায় বিদেশ থেকে অনেক কর্মী ফেরত আসেন দেশে। তখন দেখা যায় তাদের কিছু দক্ষতা অর্জিত হয়েছে সেটির কোনো সনদ নেই। আমরা তাদের একটি ফর্মুলার মাধ্যমে অল্প কিছু প্রশিক্ষণ দিয়ে বা পরীক্ষা নিয়ে সনদ দেয়ার ব্যবস্থা করছি। যাতে করে তার দক্ষতাটা সে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে।

যে যেই কাজে দক্ষ তাকে সেই কাজেই নিয়োগ করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রির সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে আপনাদের কোনো ভূমিকা কি থাকছে?

একাডেমিয়া ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে একটা যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের দক্ষতা অর্জনে সহায়ক পরিবেশ দরকার। আমরা কিন্তু সেই পরিবেশ তৈরিতে কাজ করছি। ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে আমরা একাডেমিয়ার লিংকটা করে দেব। অনেকেই আছেন বিশ্ববিদ্যালয় পাস করেছে কিন্তু দক্ষতা নেই। আমরা চাই তারা দক্ষ হয়ে উঠবেন এবং ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে একটা সম্পর্ক তৈরি হবে। ফলে তরুণরা পাস করার পর চাকরি অথবা উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ শুরু করতে পারবে। চুল যারা কাটে তাদেরও কিন্তু একটা সনদ থাকে বিদেশে। আমাদের দেশে মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের ক্ষেত্রেও দেখা যায় সনদ নেই বা দক্ষতার অভাব রয়েছে। আমরা জায়গাগুলোকেও গুরুত্ব দিচ্ছি।

যেসব প্রতিষ্ঠান প্রশিক্ষণ দেবে তাদের ক্ষেত্রে আপনারা কী ধরনের নিয়ম করেছেন?

আমরা কিন্তু প্রশিক্ষণ দিই না। আমরা রেগুলেটরি বডি হিসেবে কাজ করি। যারা প্রশিক্ষণ দেবে তাদের আমরা অনুমতি দিই। আমাদের একটি পুল রয়েছে। সেই পুলে অন্তর্ভুক্ত করে প্রশিক্ষণ প্রদান যারা করবে তাদের। আমাদের কিছু পরামর্শক আছেন, তারা নিয়মটা ঠিক করে দেন এবং তারাই পরীক্ষাটা নেন। কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে বা ব্যক্তি স্ব-উদ্যোগে দক্ষ হয়ে থাকলে যখন আমাদের এখানে আবেদন করে স্বীকৃতির জন্য তখন আমরা তার একটি পরীক্ষা নেয়ার ব্যবস্থা করে। সে অনুযায়ী তার দক্ষতার লেভেল ঠিক করে তাকে সনদ প্রদান করি এবং নিজ নিজ ক্ষেত্রে আমাদের বিশেষজ্ঞরা আছেন যারা মান যাচাই করেন।

জেলা শহর বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে আসার বিষয়ে আপনাদের উদ্যোগ কী?

শুধু জেলা শহর বা ঢাকা শহরে না, প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আমাদের প্রশিক্ষণার্থী আসছেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ ঘরে বসে নিবন্ধন করতে পারছেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের কেউ যদি নিজেকে মনে করেন যে সে কোনো একটি কাজে দক্ষ এবং তার সনদ প্রয়োজন অথবা দক্ষতার স্তর যাচাই করা প্রয়োজন অথবা আরো একটু বেশি দক্ষ হতে চায় তাহলে সেই সুযোগ রয়েছে। তারা ন্যাশনাল স্কিল পোর্টালের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করতে পারবেন। তখন আমরা তার আবেদন অনুযায়ী সহায়তা দিচ্ছি। একটা নির্ধারিত ফি আছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকার। কয়েকজন একসঙ্গে হলে আমরা পরীক্ষার ব্যবস্থা করি এবং আমাদের একটি টিম গিয়ে সেই পরীক্ষাটি নেন। এরপর তার দক্ষতা অনুযায়ী তাকে সনদ দেয়া বা উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিতে চাইলে সেটিরও ব্যবস্থা করা হয়।

আপনাদের কোনো প্রতিযোগিতা বা কোনো রকম দেশব্যাপী আয়োজন কি রয়েছে?

আমাদের দেশব্যাপী কার্যক্রম তো চলছেই। এনএসডিএ আয়োজিতবঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতীয় দক্ষতা প্রতিযোগিতা ২০২৩ দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য একটি জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতা। যেখানে সারা দেশ থেকে প্রতিযোগী অংশ নিচ্ছেন। আমরা এটা শুরু করেছি জুন থেকে। ১৩টি বিভাগে প্রতিযোগিতা হচ্ছে। প্রত্যেকটা বিভাগে যারা খুব ভালো করবে তাদের থেকে তিনজনকে আমরা বিশ্ব দক্ষতা প্রতিযোগিতায় আগামী বছর ফ্রান্সের লিও শহরে নিয়ে যাব। সেই প্রতিযোগিতায় তারা বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন।

আরও