চুয়াডাঙ্গায় মাছের আঁশে নতুন কর্মসংস্থান, রফতানি হচ্ছে চীন, দ. কোরিয়া ও জাপানে

চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন মাছের বাজার ঘুরে দেখা যায়, মাছ কাটার পর আঁশ আলাদা করে সংগ্রহ করছেন শ্রমিকরা। পরে আকার ও মান অনুযায়ী বাছাই করে কয়েক দফা ধুয়ে রোদে শুকানো হয়।

এক সময় মাছ কাটার পর ফেলে দেয়া হতো আঁশ। এখন সেই আঁশই হয়ে উঠেছে বাড়তি আয়ের উৎস। চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন বাজারে মাছ কাটার পর সংগৃহীত আঁশ পরিষ্কার ও শুকিয়ে বিক্রি করছেন শ্রমিকরা। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরে এসব আঁশ যাচ্ছে ঢাকা ও চট্টগ্রামে। সেখানে প্রক্রিয়াজাতের পর রফতানি হচ্ছে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানসহ বিভিন্ন দেশে। ফলে বর্জ্য হিসেবে বিবেচিত মাছের আঁশ ঘিরে তৈরি হচ্ছে নতুন কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনা।

চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন মাছের বাজার ঘুরে দেখা যায়, মাছ কাটার পর আঁশ আলাদা করে সংগ্রহ করছেন শ্রমিকরা। পরে আকার ও মান অনুযায়ী বাছাই করে কয়েক দফা ধুয়ে রোদে শুকানো হয়। আঁশের আর্দ্রতা ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে বস্তাবন্দি করে বিক্রি করা হয় ব্যবসায়ীদের কাছে। মান ও ধরনভেদে প্রতি মণ আঁশ ২ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

জেলার বড় বাজারে মাছ কাটার কাজ করেন সাইফুল ইসলাম। তিনি জানান, প্রতিদিন ১৫-২০ কেজি পর্যন্ত আঁশ সংগ্রহ করতে পারেন। আগে ফেলে দেয়া হলেও এখন বিক্রি করে মাসে অতিরিক্ত ৩-৪ হাজার টাকা আয় হচ্ছে তার।

একই বাজারের মাছ কাটার শ্রমিক শরীফ উদ্দিন বলেন, ‘প্রতিদিন প্রায় এক মণ মাছ কাটি। সেখান থেকে পাওয়া আঁশ সংগ্রহ করে বিক্রি করছি।’ রফতানি হওয়ায় এ পণ্যের ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।

দামুড়হুদার দর্শনা বাসস্ট্যান্ড বাজারের মাছ কাটার শ্রমিক শুকুর আলীও এখন আঁশ সংগ্রহ করেন। প্রায় দেড় বছর ধরে মাছ কাটার কাজ করা এ শ্রমিক জানান, আগে আঁশ ফেলে দিতেন। পরে জানতে পারেন এগুলো রফতানি হয়। এরপর প্রশিক্ষণ নিয়ে সংগ্রহ শুরু করেন। ওয়েভ ফাউন্ডেশন তাকে এ কাজে প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম ও আর্থিক সহায়তা দিয়েছে।

স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত আঁশ বছরে দুই-তিন দফায় পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি হয়। পরে বস্তায় করে পাঠানো হয় ঢাকা ও চট্টগ্রামে। সেখানে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তা রফতানির উপযোগী করা হয়। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে এসব আঁশ।

জানা যায়, মাছের আঁশে থাকা কোলাজেনের কারণে এর ব্যবহারও বহুমুখী। বিদেশে মাছের আঁশ থেকে কোলাজেন, জেলাটিন ও কাইটোসানসহ বিভিন্ন উপাদান তৈরি করা হয়। এসব উপাদান ব্যবহৃত হয় প্রসাধনী, ত্বকের যত্নের পণ্য, লিপস্টিক, ওষুধ ও ক্যাপসুলের আবরণ তৈরিতে।

ওয়েভ ফাউন্ডেশনের মৎস্য কর্মকর্তা সাইদুর রহমান বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গা সদর ও দামুড়হুদায় ছয়জনকে মাছের আঁশ সংগ্রহে উৎসাহিত করা হচ্ছে। পিকেএসএফের সহায়তায় তাদের আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে উদ্যোক্তা তৈরি, প্রযুক্তি ও বাজারসংযোগ নিশ্চিত করা গেলে মাছের আঁশ একটি সম্ভাবনাময় রফতানি পণ্য হয়ে উঠতে পারে।’ এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পাশাপাশি মাছের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও পরিবেশবান্ধব হবে বলে জানান তিনি।

চুয়াডাঙ্গার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফরহাদুর রেজা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মাছের আঁশ রফতানি দেশের জন্য নতুন বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ তৈরি করছে। একই সঙ্গে এটি নতুন একটি পেশা ও আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। একসময় যে আঁশ বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেয়া হতো, এখন সেটিই সম্পদে পরিণত হচ্ছে।’

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, দেশে এখনো মাছের আঁশ প্রক্রিয়াজাতের জন্য পর্যাপ্ত কারখানা গড়ে ওঠেনি। ফলে সংগৃহীত আঁশ মূলত শুকিয়ে বা প্রাথমিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করে রফতানি করা হচ্ছে। দেশে আধুনিক প্রক্রিয়াজাত কারখানা স্থাপন ও মূল্য সংযোজন করা গেলে একই কাঁচামাল থেকে আরো বেশি রফতানি আয় ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব বলেও জানান তারা।

আরও