তৃতীয় কারখানায় বিনিয়োগে রাইট শেয়ার ইস্যু করবে বার্জার

বছর দুয়েক আগে চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে তৃতীয় কারখানা নির্মাণের উদ্যোগ নেয় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক রঙ উৎপাদক বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেড।

বছর দুয়েক আগে চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে তৃতীয় কারখানা নির্মাণের উদ্যোগ নেয় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক রঙ উৎপাদক বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেড। কারখানাটি নির্মাণে আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৮১৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে নিজস্ব তহবিলের পাশাপাশি রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে সংগৃহীত তহবিল বিনিয়োগ করবে কোম্পানিটি। ২০২৬ সালের এপ্রিলে কারখানাটির উৎপাদন শুরু হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। কোম্পানি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। 

তথ্যানুসারে, রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে ৩৭৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করবে বার্জার পেইন্টস। এ লক্ষ্যে কোম্পানিটি ২৭ লাখ ২৮ হাজার ১১১টি সাধারণ শেয়ার ইস্যু করবে। প্রতিটি শেয়ারের অভিহিত মূল্য ১০ টাকা। প্রিমিয়ামসহ প্রতি শেয়ারের ইস্যু মূল্য ১ হাজার ৩৭৬ টাকা। কোম্পানির বিদ্যমান ১৭টি শেয়ারের বিপরীতে একটি করে রাইট শেয়ার ইস্যুর জন্য বিনিয়োগকারীদের প্রস্তাব দেয়া হবে। এর মধ্যে বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের ৯৫ শতাংশ শেয়ারধারী উদ্যোক্তা পরিচালক জেঅ্যান্ডএন ইনভেস্টমেন্টস (এশিয়া) লিমিটেডকে ২৫ লাখ ৯১ হাজার ৬৯১ শেয়ার এবং অন্য বিনিয়োগকারীদের ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪২০টি রাইট শেয়ার ইস্যুর প্রস্তাব করা হবে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্দেশনা অনুসারে, বার্জার পেইন্টসেরঠ্রফ্রি ফ্লোট শেয়ার বাড়ানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ নির্দেশনা পরিপালনের জন্য জেঅ্যান্ডএন ইনভেস্টমেন্ট তার ভাগের পুরো রাইট শেয়ারের দাবি ত্যাগ করে সেটি কোম্পানির কর্মী ও অন্য বিনিয়োগকারীদের ছেড়ে দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। এতে কোম্পানির কর্মীরা ৪ লাখ ৮ হাজার ৯৭১ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ২১ লাখ ৮২ হাজার ৭২০টি শেয়ার পাবেন। এক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা বিদ্যমান ১৭টি শেয়ারের বিপরীতে ১৬টি করে শেয়ার পাবেন। সব মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত বিদ্যমান প্রস্তাব অনুসারে কোম্পানিটির উদ্যোক্তা পরিচালক বাদে অন্য বিনিয়োগকারীরা একটি শেয়ারের বিপরীতে একটি করেই রাইট শেয়ার পাবেন। শেয়ার হস্তান্তর ও রাইট ইস্যুর পর উদ্যোক্তা পরিচালক বাদে অন্য বিনিয়োগকারীদের কাছে বার্জারের ১০ দশমিক ২৮ শতাংশ শেয়ার থাকবে। আগামী ১০ মার্চ কোম্পানিটির বিশেষ সাধারণ সভায় (ইজিএম) এ বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের অনুমোদন নেয়া হবে। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির অনুমোদন সাপেক্ষে রাইট শেয়ার ইস্যু করা হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের কোম্পানি সচিব খন্দকার আবু জাফর সাদিক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কোম্পানির নিজস্ব তহবিল ও রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে সংগৃহীত তহবিল দিয়েই প্রকল্পের সিংহভাগ ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হবে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে কোম্পানির শেয়ারধারণের ক্ষেত্রে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশ যাতে ১০ শতাংশের বেশি থাকে। এটি করার একটি পথ হচ্ছে আমরা সবাইকে রাইট শেয়ার নেয়ার প্রস্তাব করলাম এবং সেক্ষেত্রে যার কাছে সবচেয়ে বেশি শেয়ার রয়েছে মানে আমাদের উদ্যোক্তা পরিচালক তারা রাইট শেয়ার না নিয়ে সেটি অন্যদের দিয়ে দেবেন। এ প্রক্রিয়ায় ৫ শতাংশ বিনিয়োগকারী বিদ্যমান ১৭টি শেয়ারের বিপরীতে একটি করে রাইট শেয়ার পাবেন। অন্যদিকে আমাদের উদ্যোক্তা পরিচালক রাইট শেয়ার ইস্যুর প্রক্রিয়ার তার ভাগে যে শেয়ার পাবে সেটি ক্ষুদ্র একটি অংশ কোম্পানির কর্মীদের জন্য রেখে বাকি সব শেয়ার অন্য বিনিয়োগকারীদের দিয়ে দেবে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা বিদ্যমান ১৭টি শেয়ারের বিপরীতে ১৬টি করে রাইট শেয়ার পাবেন।’ 

নতুন কারখানা স্থাপনের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের চট্টগ্রামের কারখানা বেশ পুরনো। ঢাকার কারখানাটি নতুন হলেও এর উৎপাদন সক্ষমতা আর কয়েক বছরের মধ্যেই পূর্ণ হয়ে যাবে। প্রতি বছরই আমাদের ভালো ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। এ কারণে ভবিষ্যতের চাহিদার বিষয়টি বিবেচনা করে কোম্পানির উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে নতুন কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’ 

২০০৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বার্জার পেইন্টসের অনুমোদিত মূলধন ১০০ কোটি ও পরিশোধিত মূলধন ৪৬ কোটি ৩৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা। রিজার্ভে রয়েছে ১ হাজার ২৬২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। কোম্পানিটির মোট শেয়ার সংখ্যা ৪ কোটি ৬৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮৮০। এর মধ্যে ৯৫ শতাংশই রয়েছে উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ৩ দশমিক ৬২, বিদেশী বিনিয়োগকারীদের হাতে দশমিক ২০ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ১ দশমিক ১৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।

আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে, চলতি ২০২৩-২৪ হিসাব বছরের তিন প্রান্তিকে (মার্চ-ডিসেম্বর) বার্জার পেইন্টসের আয় হয়েছে ১ হাজার ৮৭৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা, আগের হিসাব বছরের একই প্রান্তিকে যা ছিল ১ হাজার ৮৬৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। আলোচ্য হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে আয় হয়েছে ৬৭৭ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, আগের হিসাব বছরের একই সময় যা ছিল ৬৪৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এ হিসাব বছরের তিন প্রান্তিকে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ২২০ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, আগের হিসাব বছরের একই সময় যা ছিল ২০০ কোটি ৬২ লাখ টাকা। আলোচ্য হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ৭৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, আগের হিসাব বছরের একই সময় যা ছিল ৬৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা। তিন প্রান্তিকে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ৪৭ টাকা ৫৪ পয়সা, যা আগের হিসাব বছরের একই সময়ে ছিল ৪৩ টাকা ২৬ পয়সা। গত ৩১ ডিসেম্বর শেষে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ২৬২ টাকা ৯৭ পয়সায়।

সমাপ্ত ২০২২-২৩ হিসাব বছরে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ৪০০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশের দিয়েছে বার্জার পেইন্টসের পর্ষদ। আলোচ্য হিসাব বছরে বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের সমন্বিত কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ৩০১ কোটি ৫ লাখ টাকা, আগের হিসাব বছরে যা ছিল ২৯০ কোটি ৭০ লাখ টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির নিট মুনাফা বেড়েছে ১০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা বা ৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ। আলোচ্য হিসাব বছরে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছে ৬৪ টাকা ৯১ পয়সা, আগের হিসাব বছরে যা ছিল ৬২ টাকা ৬৮ পয়সা। গত বছরের ৩১ মার্চ শেষে কোম্পানিটির এনএভিপিএস দাঁড়িয়েছে ২৭৯ টাকা ৭৮ পয়সায়য় আগের হিসাব বছর শেষে যা ছিল ২২৭ টাকা ৩৯ পয়সা।

৩১ মার্চ সমাপ্ত ২০২১-২২ হিসাব বছরের জন্য বিনিয়োগকারীদের ১০০ শতাংশ চূড়ান্ত নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ। এর আগে আলোচ্য হিসাব বছরের প্রথম নয় মাসের আর্থিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে শেয়ারহোল্ডারদের ৩০০ শতাংশ নগদ অন্তর্বর্তী লভ্যাংশ দিয়েছে কোম্পানিটি। আলোচ্য হিসাব বছরে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী সমন্বিত নিট মুনাফা হয়েছে ২৯০ কোটি ৭০ লাখ টাকার বেশি, আগের হিসাব বছরে যা ছিল ২৬৬ কোটি ৯১ টাকার বেশি। আলোচ্য হিসাব বছরে কোম্পানিটির সমন্বিত ইপিএস হয়েছে ৬২ টাকা ৬৮ পয়সা, আগের হিসাব বছরে যা ছিল ৫৭ টাকা ৫৫ পয়সা। ৩১ মার্চ ২০২২ শেষে কোম্পানিটির সমন্বিত এনএভিপিএস দাঁড়ায় ২২৭ টাকা ৩৯ পয়সায়, আগের হিসাব বছর শেষে যা ছিল ২৩২ টাকা ২৯ পয়সা।

২০২১ সালের ৩১ মার্চ সমাপ্ত হিসাব বছরের জন্য ৩৭৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে কোম্পানিটি। ২০২০ হিসাব বছরে ২৯৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল কোম্পানিটি। আগের হিসাব ২৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেয় তারা। ২০১৮ হিসাব বছরে মোট ৩০০ শতাংশ লভ্যাংশ পেয়েছিলেন কোম্পানিটির শেয়ারহোল্ডাররা। এর মধ্যে ২০০ শতাংশ নগদ ও ১০০ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ।

আরও