যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী পোশাকের আমদানি বাড়লেও কমছে বাজার হিস্যা

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী তৈরি পোশাকের আমদানি বাড়লেও কমছে মার্কেট শেয়ার বা বাজার হিস্যা।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী তৈরি পোশাকের আমদানি বাড়লেও কমছে মার্কেট শেয়ার বা বাজার হিস্যা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থার (আইটিসি) গত তিন বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে।

আইটিসির তথ্যানুযায়ী, ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ১০৫ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করে। ২০২৩ সালে এ অংক কমে দাঁড়ায় ৮১ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারে। ২০২৪ সালে কিছুটা বেড়ে হয় ৮৩ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার। ওই তিন বছরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে যথাক্রমে ৯ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার, ৭ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার এবং ৭ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করেছে। এ সময় দেশটির বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের হিস্যা যথাক্রমে ২০২২ সালে ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ ছিল।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কভিড, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির অস্থিরতার কারণে বিগত তিন বছর ক্রেতারা বিপদের মধ্যে ছিলেন। তাদের বিক্রি কমে যাওয়ায় আমাদেরও রফতানি কমেছিল। এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের নানা নীতি ও আন্তর্জাতিকভাবে কিছুটা স্ট্যাবল পরিস্থিতির কারণে বাজার ফিরতে শুরু করেছে। ফলে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের রফতানি কিছুটা বেড়েছে, সামনে আরো বাড়বে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সুবিধা আমরা কতটুকু নিতে পারব সেটিই এখন দেখার বিষয়।’

এখানে পলিসিগত নানা সমস্যা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ব্যাংক খাতে সমস্যা রয়েছে। এছাড়া গ্যাস, বিদ্যুৎ ও কাঁচামাল আমদানিসংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে। সব মিলিয়ে আমরা সুবিধা ততটুকুই নিতে পারব, যতটুকুর জন্য নিজেরা প্রস্তুত।’

দেশের তৈরি পোশাক খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের জন্য নানা সম্ভাবনা তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কিছু পদক্ষেপ। দায়িত্ব গ্রহণের দুই সপ্তাহের মাথায় তিনি কানাডা, মেক্সিকো ও চীন থেকে পণ্য আমদানিতে বাড়তি শুল্ক আরোপ করেন। ফলে প্রতিযোগিতার বাজারে কিছুটা এগিয়ে থাকছে বাংলাদেশ। চীনা পণ্যে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়েছে। এতে দেশটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রয়াদেশ সরাবে। ফলে বাড়তি ক্রয়াদেশ বা অর্ডার পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বাংলাদেশের জন্য। এমনকি বিনিয়োগকারীরা চীন থেকে কারখানা সরিয়ে এখন অন্য দেশে নিতে আগ্রহী হতে পারেন। বিনিয়োগের সেই সুযোগ বাংলাদেশও নিতে পারে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবার ক্ষমতায় থাকার সময় ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়। ২০১৯ সাল থেকে চীন থেকে ক্রয়াদেশ সরতে থাকে, যার একটি অংশ বাংলাদেশেও আসে। ওই বছর যুক্তরাষ্ট্রে সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পোশাক রফতানি করে বাংলাদেশ। এর মধ্যে কভিডের কারণে রফতানি কমলেও ২০২২ সালে অবস্থান ধরে রাখার লড়াইয়ে টিকে থাকে বাংলাদেশ। যদিও পরের বছর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রফতানি আবারো কমে যায়। তবে এ সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে গেলে বাংলাদেশকে ভারত ও ভিয়েতনামের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কভিড-পরবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে নানা জটিলতার কারণে তৈরি পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশ কিছুটা অস্বস্তির মধ্যে রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রফতানির এ চিত্র বিশ্লেষণে বোঝা যাচ্ছে, দেশটিতে বাংলাদেশের পণ্য এখনো পছন্দের তালিকায় ওপরের দিকে রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ঘটলে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা আরো বাড়বে বলে মনে করেন বিজিএমইএর সাবেক এ পরিচালক। তিনি বলেন, ‘এটি বাংলাদেশকে সংকট থেকে পুনরুদ্ধার করার সক্ষমতা প্রদর্শন করে, শ্রমিকদের বিষয়, নিরাপত্তা, সম্মতি, উদ্ভাবন এবং বৈচিত্র্যকরণের প্রতি দেশের অঙ্গীকার তুলে ধরে। বাংলাদেশ এখনো আমেরিকান ব্র্যান্ডগুলোর জন্য একটি ভালো পছন্দ হিসেবে রয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, মার্কিন অর্থনীতি উন্নতি করার সঙ্গে সঙ্গে এ প্রবণতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।’

অন্যদিকে ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক রফতানিতে বরাবরের মতো শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে চীন। দেশটি ২০২৪ সালে ১ হাজার ৬৫১ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করেছে। এতে প্রবৃদ্ধি দশমিক ৭৯ শতাংশ হয়েছে। একই বছর যুক্তরাষ্ট্রে ১ হাজার ৪৯৮ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করে ভিয়েতনাম, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ৫ দশমিক ৬১ শতাংশ বেশি। মার্কিন বাজারে ভিয়েতনামের পর তৃতীয় শীর্ষ রফতানিকারক দেশ বাংলাদেশ।

আরও