আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদনের পর চুক্তিটি কার্যকর হলে প্রথম দিন থেকেই বাংলাদেশী ৮ হাজার ৪২৮টি পণ্য দেশটির বাজারে তাৎক্ষণিক শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। বিপরীতে বাংলাদেশের বাজারে ১ হাজার ৫৪টি পণ্যে একই সুবিধা ভোগ করবে দক্ষিণ কোরিয়া। সার্বিকভাবে বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্য ও সেবা দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পাবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বাজারে দেশটির ৮৭ শতাংশ পণ্য একই ধরনের সুবিধার আওতায় আসবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে গতকাল ‘সিইপিএ নেগোসিয়েশন কনক্লুশন সেরিমনি’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে যৌথভাবে এ ঘোষণা দেন বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী হান কু ইয়েও। প্রায় এক বছর ধরে পাঁচ দফা আনুষ্ঠানিক আলোচনা ও একাধিক ভার্চুয়াল বৈঠকের পর দুই দেশ নেগোসিয়েশন সম্পন্ন করল।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, সিইপিএ বাস্তবায়নের প্রস্তুতি হিসেবে প্রথমে দুই দেশ টার্মস অব রেফারেন্স (টিওআর) চূড়ান্ত করে। পরে ট্রেড নেগোসিয়েটিং কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ১১টি টেকনিক্যাল ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয়। ২০২৫ সালের আগস্টে সিউলে প্রথম দফা আলোচনা শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশে দুই দফা এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় তিন দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া অনিষ্পন্ন বিষয়গুলো নিয়ে প্রধান নেগোসিয়েটর পর্যায়ে প্রায় ৪০টি অনলাইন বৈঠকের মাধ্যমে আলোচনা সম্পন্ন হয়।
চুক্তিটি কার্যকর হলে শুধু রফতানি নয়; বরং শিল্পায়ন, বিদেশী বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে এটি নেগোসিয়েটর পর্যায়ের আলোচনার সমাপ্তি। দুই দেশের আইনগত প্রক্রিয়া ও মন্ত্রিসভার অনুমোদন শেষে বাংলাদেশ-দক্ষিণ কোরিয়া সিইপিএ আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে।
অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির একটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো এ ধরনের উচ্চমানের চুক্তির নেগোসিয়েশন শেষ করতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে দেশের তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, জুতা, ওষুধ এবং হোম টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন রফতানি পণ্য দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে আরো প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করবে।’ ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য অর্জনে উচ্চ প্রবৃদ্ধি, রফতানি সম্প্রসারণ এবং বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে এ চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বাণিজ্য কখনই একমুখী নয়, এটি দ্বিমুখী। এ ধরনের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি দুই দেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণের পথ প্রশস্ত করে। ’
তিনি বলেন, ‘সরকার ব্যবসা করে না, বরং বিনিয়োগ ও ব্যবসার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে এ চুক্তির পাশাপাশি বাংলাদেশ আরো ১০-১২টি দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এ আলোচনা শুরু এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক জোট আরসিইপিতে যোগদানের উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।’ এসব পদক্ষেপ বাংলাদেশকে বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে আরো সংযুক্ত করবে এবং বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করবে বলে মন্তব্য করেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী হান কু ইয়েও বলেন, ‘দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাস ৫৬ বছরের। এতদিন এ সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু ছিল মূলত টেক্সটাইল খাত। এখন সময় এসেছে প্রযুক্তি, সরবরাহ ব্যবস্থা, শিল্প সহযোগিতা এবং বিনিয়োগের মতো নতুন খাতে অংশীদারত্ব সম্প্রসারণের।’
সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘সিইপিএ হলো বাংলাদেশ ও কোরিয়ার মধ্যে একটি মহাসড়ক তৈরির মতো। আগে এমন একটি কাঠামো না থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য রফতানি, আমদানি কিংবা বিনিয়োগ সহজ ছিল না। এখন এ আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় কোরীয় কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশে আরো বেশি আস্থা পাবে।’
হান কু ইয়েও আরো বলেন, ‘সরকার কোনো কোম্পানিকে বিনিয়োগে বাধ্য করতে পারে না। তবে এ চুক্তি বিনিয়োগ সুরক্ষা, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং আরো ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করবে। ফলে কোরীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন এবং এখান থেকে কোরিয়ার বাজারে রফতানিতে আরো আগ্রহী হবে।’
তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় পরিবর্তনের কারণে অনেক আন্তর্জাতিক কোম্পানি নতুন উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ একটি অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে। এ চুক্তি বাংলাদেশকে বৈশ্বিক বিনিয়োগ মানচিত্রে আরো দৃশ্যমান করে তুলবে।’
পণ্য বাণিজ্যের পাশাপাশি সেবা খাতেও দুই দেশ বাজার উন্মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে। বাংলাদেশ দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য ৯৫টি উপখাত উন্মুক্ত করবে। বিপরীতে দেশটি বাংলাদেশের জন্য ১১১টি উপখাতে চারটি মোডে সেবা বাণিজ্যের সুযোগ দেবে। এতে প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনশক্তির অংশগ্রহণ এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা আরো জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ রফতানি করে প্রায় ৪৯১ দশমিক ৭৩ মিলিয়ন ডলার এবং আমদানি করে প্রায় ৯০২ দশমিক ৯০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক, হোম টেক্সটাইল, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জুতা, ওষুধ, পাট ও পাটজাত পণ্য, হিমায়িত খাদ্য এবং সিরামিক সামগ্রী রফতানি হয়। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বাংলাদেশে আমদানি হয় শিল্পযন্ত্র, লোহা ও ইস্পাত, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, প্লাস্টিক, রাসায়নিক ও কাগজজাত পণ্য।