এ নিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো এ পূর্বাভাস কমাল তেল উৎপাদন ও রফতানিকারক দেশগুলোর সংগঠন সংস্থাটি। মূলত মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধ ও সরবরাহ লাইনে বিঘ্ন ঘটায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ওপেকের সর্বশেষ মাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক সংকটে জ্বালানি তেলের বাজারে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব পড়েছে চাহিদার ওপর। একই সময় যুক্তরাষ্ট্রের জরুরি রাষ্ট্রীয় মজুদও চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। খবর রয়টার্স।
সম্প্রতি প্রকাশিত মাসিক প্রতিবেদনে ওপেক জানায়, ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী দৈনিক অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাহিদা বাড়ার পরিমাণ কমিয়ে ৭ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল নির্ধারণ করা হয়েছে। আগের পূর্বাভাসে দৈনিক চাহিদা বাড়ার পরিমাণ ধরা হয়েছিল ৯ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল। তবে চাহিদা কমার এ প্রবণতা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) মতো অন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তুলনায় ওপেকের ধারণা, ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের ব্যবহারে নেতিবাচক প্রভাব কিছুটা কম পড়েছে।
সংস্থাটি আশা করছে, বছরের বাকি সময় বিশ্ব অর্থনীতির পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হতে পারে। এ সম্ভাব্য অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ওপর ভিত্তি করে ওপেক ২০২৭ সালের জন্য জ্বালানি তেলের চাহিদা বৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়েছে। নতুন হিসাব অনুযায়ী, ২০২৭ সালে বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাহিদা দৈনিক ১৯ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল বাড়তে পারে, যা আগের পূর্বাভাসের চেয়ে ২ লাখ ১০ হাজার ব্যারেল বেশি।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুট হরমুজ প্রণালি মাসের পর মাস বন্ধ ছিল। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কয়েক লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলন ও সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। সম্প্রতি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার একটি অন্তর্বর্তী শান্তি চুক্তির পর জ্বালানি তেল উত্তোলন আবার বাড়তে শুরু করেছিল। কিন্তু নতুন করে সামরিক হামলা শুরু হওয়ায় জ্বালানি তেল সরবরাহ নিয়ে আবারো উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ওপেকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেশ স্থিতিশীল ছিল। যদি ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কমে আসে এবং জ্বালানি বাজার ও বাণিজ্যপ্রবাহ আরো স্বাভাবিক হয়, তবে বছরের দ্বিতীয়ার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) বৈশ্বিক অর্থনীতি আরো ভালো অবস্থানে পৌঁছতে পারে।
রাশিয়াসহ ওপেকের সহযোগী দেশগুলোর জোট ওপেক প্লাস গত এপ্রিল থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলনের কোটা বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছিল। কিন্তু হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় নির্ধারিত কোটা অনুযায়ী উত্তোলন বাড়ানো সম্ভব হয়নি। জুনে ওপেক প্লাসের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলনের দৈনিক গড় ছিল ৩ কোটি ৬২ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল, যা মে মাসের তুলনায় প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল বেশি। মে মাসের এ হিসাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) তথ্যও অন্তর্ভুক্ত ছিল, যারা ১ মে আনুষ্ঠানিকভাবে ওপেক ও ওপেক প্লাস জোট ত্যাগ করেছে।
বিশ্ববাজারের এ অস্থিরতার বড় প্রভাব পড়েছে শীর্ষ ব্যবহারকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর। মার্কিন জ্বালানি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (এসপিআর) বা জরুরি মজুদ থেকে গত সপ্তাহে প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল কমে গেছে। বর্তমানে এ মজুদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩১ কোটি ৬৫ লাখ ব্যারেলে, যা ১৯৮৩ সালের এপ্রিলের পর সর্বনিম্ন।
বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জরুরি তহবিল থেকে ১৭ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল বাজারে ছাড়ার যে চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র করেছিল, এটি তারই অংশ। গত ফেব্রুয়ারির শেষে যুদ্ধ শুরুর পর ১০ জুলাই পর্যন্ত জরুরি মজুদ থেকে ৯ কোটি ৮৯ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল কমেছে। সব মিলিয়ে দেশটির মোট অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুদ এখন ৭৩ কোটি ৮ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে, যা ১৯৮৪ সালের পর সবচেয়ে কম।