কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত প্রসার বদলে দিচ্ছে প্রযুক্তি খাতের কর্মসংস্থানের চিত্র। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যবসা পুনর্গঠন, ব্যয় কমানোর উদ্যোগ ও দুর্বল ব্যবসায়িক ফল। এসব কারণে চলতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো কর্মী ছাঁটাই বাড়িয়েছে। ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত এ খাতে ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। খবর হিন্দুস্তান টাইমস।
ছাঁটাইবিষয়ক তথ্য অনুসরণকারী প্রতিষ্ঠান ট্রুআপের হিসাবে এ সংখ্যা এরই মধ্যে গত বছরের তুলনায় দ্রুতগতিতে বাড়ছে। ২০২৫ সালের পুরো বছরে চাকরি হারিয়েছিলেন ২ লাখ ৪৫ হাজারের বেশি প্রযুক্তিকর্মী।
চলতি বছরের ছাঁটাইয়ের তালিকায় রয়েছে অ্যাপল, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, ওরাকল, মেটা, ভিসা, সিসকো, পেপ্যালসহ বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। অনেক কোম্পানি এআইয়ে বিনিয়োগ বাড়াতে কর্মী কমাচ্ছে। আবার কেউ কেউ ব্যবসার ধরন বদলাতে গিয়ে কর্মী ছাঁটাই করছে।
ওরাকলে বড় ধরনের ছাঁটাই
চলতি বছরের অন্যতম বড় কর্মী ছাঁটাই করেছে ওরাকল। জুনে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে দেয়া এক নথিতে এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার ও ক্লাউড পরিষেবা দেয়া কোম্পানিটি জানায়, গত এক বছরে প্রায় ২১ হাজার কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে। এ সংখ্যা প্রতিষ্ঠানটির মোট কর্মীর প্রায় ১৩ শতাংশ।
ওরাকলের মতো অনেক প্রতিষ্ঠানই একদিকে কর্মী কমাচ্ছে, অন্যদিকে নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে এআই-কেন্দ্রিক ব্যবসা সম্প্রসারণে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে অর্থ ও জনবল।
তালিকায় অ্যাপলও
আগস্টে নতুন দফায় কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দেয় অ্যাপল। প্রতিষ্ঠানটির ভিশন বিভাগ থেকে অন্তত ৬০ কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়েছে। দলটি অ্যাপলের ভিশন প্রো হেডসেট নিয়ে কাজ করে। অ্যাপল এআই কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত কিছু কর্মীও কমাচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানের ইন্টেলিজেন্ট সিস্টেমস এক্সপেরিয়েন্স গ্রুপের কর্মীদের একটি অংশ ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন। অ্যাপল ডিভাইসে ব্যবহৃত কিছু এআই সিস্টেম নিয়ে কাজ করে দলটি।
মাইক্রোসফট উবার ও অ্যামাজন
জুলাইয়ে মাইক্রোসফট আরো ৪ হাজার ৮০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দেয়। এটি প্রতিষ্ঠানটির মোট কর্মীর প্রায় ২ দশমিক ১ শতাংশ। এতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে মাইক্রোসফটের এক্সবক্স গেমিং ব্যবসায়।
এক্সবক্সের প্রধান আশা শর্মা জানান, ২০২৭ অর্থবছর পর্যন্ত বিলুপ্ত করা হবে প্রায় ৩ হাজার ২০০ পদ। এর মধ্যে ১ হাজার ৬০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দেয়া হয় জুলাইয়ে।
ভিসাও প্রায় ২ হাজার ৬০০ কর্মী ছাঁটাই করছে। এটি প্রতিষ্ঠানটির মোট কর্মীর প্রায় ৭ শতাংশ। মূলত প্রযুক্তি ও পণ্য উন্নয়ন দলের কর্মীরা এতে প্রভাবিত হবেন। ব্যবসার পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে খাপ খাইয়ে আরো দক্ষভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানায় ভিসা। রাইড শেয়ারিং পরিষেবা উবারও গ্রাহকসেবা বিভাগের প্রায় ১০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই করেছে বলে জানা গেছে।
ই-কমার্স জায়ান্ট অ্যামাজনও এজিআই বিভাগে কর্মী কমিয়েছে। তবে কতজন কর্মী এতে প্রভাবিত হয়েছেন, তা জানায়নি প্রতিষ্ঠানটি। অ্যামাজনের মতে, গ্রাহকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এআই প্রকল্পগুলোয় বেশি মনোযোগ দিতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।
ইভি ও ক্লাউড ব্যবসায় ছাঁটাই
জুনে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি (ইভি) নির্মাতা লুসিড প্রায় ১৮ শতাংশ কর্মী কমানোর ঘোষণা দেয়। মুনাফা বাড়ানোর লক্ষ্যে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানায় ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক কোম্পানিটি।
একই মাসে ক্লাউড কম্পিউটিং কোম্পানি র্যাকস্পেস ৭৫০ কর্মী ছাঁটাই করেছে। এটি বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠানটির মোট কর্মীর প্রায় ১৫ শতাংশ। এআইকে কেন্দ্র করে ব্যবসার অগ্রাধিকার বদলানোর অংশ হিসেবে ছাঁটাইয়ের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানায় র্যাকস্পেস।
মেটা সিসকো ও পেপ্যাল
প্রযুক্তি খাতে বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা আসে মে মাসে। আর্থিক সফটওয়্যার কোম্পানি ইনটুইট প্রায় তিন হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনার কথা জানায়। এটি কোম্পানির মোট কর্মীর ১৭ শতাংশ। ইনটুইটের প্রধান নির্বাহী সাসান গুডারজি কর্মীদের জানান, বিভিন্ন সেবায় এআই যুক্ত করার দিকে আরো বেশি মনোযোগ দিতে পরিবর্তন প্রয়োজন।
সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্ট মেটাও মে মাসে প্রায় আট হাজার কর্মী ছাঁটাই শুরু করে। এ সংখ্যা কোম্পানির মোট কর্মীর ১০ শতাংশ। পাশাপাশি প্রায় ছয় হাজার খালি পদও বাতিল করার পরিকল্পনা করে প্রতিষ্ঠানটি। এর আগে মার্চে ৭০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দেয় মেটা।
টেক জায়ান্টটি জানায়, ব্যবসার অগ্রাধিকার পরিবর্তনের অংশ হিসেবেই এ সিদ্ধান্ত। অ্যামাজনও ওই মাসে নতুন করে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দেয়।
সিসকোও প্রায় চার হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করে। তবে একই সময় এআই-সংশ্লিষ্ট খাতেও বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা জানায় প্রতিষ্ঠানটি। এদিকে পেপ্যাল আগামী কয়েক বছরে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কর্মী ছাঁটাই করার পরিকল্পনা করেছে। এটি প্রতিষ্ঠানটির মোট কর্মীর প্রায় ২০ শতাংশ।
নাইকি স্ন্যাপ ও ডিজনি
এপ্রিলেও প্রযুক্তি ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলোয় ছাঁটাই অব্যাহত ছিল। ওই মাসে নাইকি ছেঁড়েছেন প্রায় ১ হাজার ৪০০ কর্মী। এর আগে জানুয়ারিতে ৭৭৫ জনকে ছাঁটাই করে ক্রীড়া সামগ্রী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া ভিজুয়াল মেসেজিং অ্যাপ স্ন্যাপ এ সময় প্রায় এক হাজার কর্মী ছাঁটাই করে। বিনিয়োগকারীদের চাপের মুখে কর্মী ও ব্যয় কাঠামো পুনর্বিন্যাসের এ উদ্যোগ নেয় প্রতিষ্ঠানটি। এদিকে ডিজনিও এক হাজার কর্মী ছাঁটাই করে। জশ ডি’আমারো প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব নেয়ার দুই মাসের মাথায় এ সিদ্ধান্ত আসে।
এপিক গেমস
মার্চে গেম নির্মাতা এপিক গেমস এক হাজারের বেশি কর্মী ছাঁটাই করে। প্রধান নির্বাহী টিম সুইনি জানান, ফোর্টনাইট গেমের ব্যবহারকারীদের আগ্রহ কমে যাওয়ায় কোম্পানির আয় কমেছে। ফলে বড় ধরনের ব্যয় কমানোর প্রয়োজন হয় এপিক গেমসের।