এ অবস্থায় সয়াবিন ও পাম অয়েলের মূল্য নির্ধারণে সরকারি নিয়ন্ত্রণ তুলে দিয়ে আবারো প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা চালুর আহ্বান জানিয়েছেন তারা। তবে এ-সংক্রান্ত সর্বশেষ বৈঠকেও কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের প্রধান দুই ভোজ্যতেলের আমদানি আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে।
দেশে সয়াবিন ও পাম অয়েল—এ দুই ভোজ্যতেল আমদানি পরিমাণের দিক থেকে কমেছে। ট্যারিফ কমিশনের হিসাবে, দেশে ভোজ্যতেলের বার্ষিক চাহিদা ২৩-২৪ লাখ টন। যদিও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সয়াবিন ও পাম অয়েল আমদানি হয়েছে স্বাভাবিক চাহিদার চেয়ে কম। আবার পরিমাণগত দিক থেকে আগের একই সময়ের তুলনায়ও প্রায় ১০ শতাংশ কম আমদানি হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আমদানি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সদ্যবিদায়ী অর্থবছরে সয়াবিন ও পাম অয়েল আমদানি হয়েছে মোট ২২ লাখ ২৩ হাজার টন। এতে মোট ব্যয় হয়েছে ৩০ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। তবে শুল্ক, ভ্যাটসহ আমদানি মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকায়। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সয়াবিন ও পাম অয়েলের আমদানির পরিমাণ ছিল ২৪ লাখ ৫০ হাজার টন। আর আমদানি মূল্য ছিল ৩১ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। তবে শুল্ক, ভ্যাটসহ হিসাব করলে এ আমদানি মূল্য দাঁড়ায় ৩৪ হাজার ৮৯৬ কোটি টাকায়।
ভোজ্যতেলের উচ্চ চাহিদা সত্ত্বেও স্থানীয়ভাবে তেলবীজ উৎপাদনের পরিমাণ খুবই কম। ফলে আমদানি করেই ভোজ্যতেলের সম্পূর্ণ চাহিদা মেটাতে হয়। বর্তমানে সয়াবিন ও পাম অয়েল বড় পরিসরের আমদানি এবং সরবরাহ মূলত টিকে গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই) ও স্মাইল ফুড প্রডাক্টস—এ তিন কনগ্লোমারেটের ওপর নির্ভরশীল। সয়াবিন তেল অপরিশোধিত (ক্রুড) অবস্থায় এনে দেশে পরিশোধন করে তারপর বাজারজাত করছেন উদ্যোক্তারা। তবে পাম অয়েল পরিশোধিত অবস্থায় এনেই বাজারজাত করা হয়। পাশাপাশি অপরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানির পাশাপাশি ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন বীজ এনে দেশে ভোজ্যতেল উৎপাদন করছে কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠী।
এনবিআরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আমদানি হওয়া এ দুই ভোজ্যতেলের প্রায় ৭০ শতাংশই পাম অয়েল। সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে ৬ লাখ ৯০ হাজার টন। বাকি ১৫ লাখ ৩৩ হাজার টনই এসেছে পাম অয়েল। অন্যদিকে এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছিল ৯ লাখ ৩১ হাজার টন। বাকি ১৫ লাখ ১৯ হাজার টনই ছিল পাম অয়েল।
শীর্ষ ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এমজিআইয়ের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ ঠিক রাখাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ স্থানীয় উৎপাদন, আমদানি ও মজুদ বিবেচনায় রেখে চাহিদা ও সরবরাহে সামঞ্জস্য ঠিক থাকা জরুরি। সরকার পণ্যের দাম নির্ধারণ না করে বরং আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যয় ও স্থানীয় বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রতিযোগিতামূলক বাজারে মূল্য নির্ধারণের জন্য ছেড়ে দেয়াটা সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা।’
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সর্বশেষ দেয়া চিঠিতে ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারণ প্রক্রিয়া বাজার ব্যবস্থার ওপর ছেড়ে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। বর্তমানে এ দর সরকার ঠিক করে দেয়। সংগঠনটির দাবি, আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যয় ও স্থানীয় বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রতিযোগিতামূলক বাজারই মূল্য নির্ধারণের সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কয়েকটি প্রস্তাবও দিয়েছে তারা।
সংগঠনটি বলছে, ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারণে বিদ্যমান এলসি, ইন-বন্ড ও এক্স-বন্ড মূল্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কমোডিটি এক্সচেঞ্জ, বিশেষত শিকাগো বোর্ড অব ট্রেডের (সিবিওটি) বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নেয়া উচিত। পরে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন এসব তথ্য যাচাই করতে পারে। অ্যাসোসিয়েশনটি আরো প্রস্তাব করেছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের একটি কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল সার্বিক বাজার পরিস্থিতি তদারক করবে। কোম্পানিগুলো প্রয়োজনীয় তথ্য ওই সেলে সরবরাহ করবে। পাশাপাশি কোনো সরকারি সংস্থার তথ্য প্রয়োজন হলে তা এ সেলের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে। এতে তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে এবং একই তথ্য বারবার চাওয়ার প্রয়োজন কমবে বলে দাবি সংগঠনটির।
চিঠিতে আরো বলা হয়, প্রয়োজন মনে করলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড চালু করতে পারে, যেখানে কোম্পানিগুলোর মূল্য নির্ধারণ-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। চাইলে অ্যাসোসিয়েশন নিজস্ব অর্থায়নে এমন ড্যাশবোর্ড তৈরির উদ্যোগও নিতে পারে।
টিকে গ্রুপের পরিচালক শফিউল আতাহার তসলিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভোজ্যতেলের মতো পণ্য আমদানিতে বড় অংকের বিনিয়োগ প্রয়োজন। তাই আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যয় ও স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতামূলক বাজারের মাধ্যমে মূল্য নির্ধারণের সুযোগ দেয়া উচিত। এতে ভোক্তা ও ব্যবসায়ী উভয়ই উপকৃত হবে। বিষয়টি আমরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বলে আসছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমানে যে দামে ভোজ্যতেল আমদানি করেছি, তার তুলনায় প্রতি লিটারে প্রায় ২০ টাকা কমে বিক্রি করতে হচ্ছে। সরকারের আশ্বাসের ওপর ভরসা করেই এখন পর্যন্ত আমদানি ও সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু এভাবে দীর্ঘদিন লোকসান দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।’
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের আশ্বাস দেয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। অথচ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে কোনো প্রতিষ্ঠান অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ালে অন্য প্রতিষ্ঠান কম মূল্যে পণ্য সরবরাহ করে ভারসাম্য সৃষ্টি করবে। এতে বাজারও স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকবে। অন্যথায় ধারাবাহিক লোকসানের কারণে আমদানিকারক ও উৎপাদক প্রতিষ্ঠান একসময় সরবরাহ ব্যবস্থা ধরে রাখতে পারবে না।