কভিড-১৯ মহামারী শুরুর পর মানুষকে এমন অনেক কিছুই দেখতে হয়েছে, যা সে আগে কখনো দেখেনি। এমন অনেক কাজ করতে হয়েছে, যার কথা আগে হয়তো কখনো ভাবনাতেই আসেনি। এমনকি পৃথিবীতে এমন অনেক কাজ হয়েছে, যেগুলো মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়া করার কথা ভাবাই যায়নি কখনো। অটোমেশনে বা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে চলা এমন সব কাজের জন্য আবার মানুষ নিয়োগ দেয়া হবে কিনা তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে।
কিছু উদাহরণ দিলে হয়তো বিষয়টা বুঝতে সহজ হবে।
লস অ্যাঞ্জেলেসে মহাসড়কের পাশের চেইন রেস্তোরাঁ আরবিজে গিয়ে আপনাকে রোস্টেড বিফ স্যান্ডউইচ অর্ডার দিতে হলে কথা বলতে হবে টোরির সঙ্গে।
এরপর টোরি অর্ডারটি পাঠাবে লাইন কুক বা নির্ধারিত খাদ্য প্রস্তুতকারীর কাছে।
এই টোরি আসলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট।
আরবিজের ক্যালিফোর্নিয়া শাখায় এ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন সহকারী প্রতিস্থাপন করেছেন আমির সিদ্দিক।
তিনি বলেন, এটার সুবিধা হলো, টোরি কখনো অসুস্থ হয় না।
তাকে নভেল করোনাভাইরাস আক্রান্ত করে না।
আবার এর ওপর চোখ বন্ধ করে বিশ্বাসও করা যায়।
গত বছর মহামারী শুরু হলে এটি মার্কিনদের স্বাস্থ্যের যতটা না ক্ষতি করেছে, তারচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে কর্মক্ষেত্রের।
মহামারীর প্রকোপে বহু মানুষ কাজ হারিয়েছে।
এরপর যখন পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু হলো, তখন দেখা দিল কর্মী সংকট।
পরিস্থিতি এমনও হয়েছে যে, বেশি অর্থ দিয়েও চাহিদামতো কর্মী পাচ্ছিল না প্রতিষ্ঠানগুলো।
আর সেই সময়ই কিছু প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্য স্থানগুলোতে মানুষের বদলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার সহায়তা নিতে শুরু করে।
বিশেষ করে গ্রাহকসেবা-সংক্রান্ত কাজ।
যেখানে গ্রাহকদের সরাসরি মানুষের সংস্পর্শে আসতে হবে না, আবার কাঙ্ক্ষিত সেবাও পাবেন তারা।
অতীত অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে এটা বলা যেতে পারে যে, স্বয়ংক্রিয় এ ব্যবস্থা হয়তো কাজের নতুন অনেক ক্ষেত্র তৈরি করবে।
তবে একই সঙ্গে কম দক্ষতাসম্পন্ন ও কম আয়ের কর্মীরা কাজ হারাবেন।
আর এর ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
নিজের প্রতিষ্ঠানে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা স্থাপন করেছেন এমন কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, মহামারী না শুরু হলে তারা হয়তো এসব প্রযুক্তি প্রয়োগের কথা ভাবতেন না। তখন নিজস্ব কর্মীদের দিয়েই কাজ চালিয়ে নিতে হতো। কিন্তু স্বয়ংক্রিয় এ ব্যবস্থার মাধ্যমে বেশ ঝামেলাহীনভাবেই কাজ করা যাচ্ছে। এর ফলে তুলনামূলক কম কর্মী দিয়ে কাজ চালানো যাচ্ছে।
ইউনিভার্সিটি অব রেডল্যান্ডসের অর্থনীতিবিদ জোহানেস মোনিয়াস বলেন, আদর্শগতভাবে দেখলে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা কর্মীদের আরো ভালো কাজের পরিবেশ দিতে পারে।
অবশ্য সেটা তখনই সম্ভব যদি তাদের প্রযুক্তিটি সম্পর্কে যথাযথ প্রশিক্ষণ দেয়া যায়।
কিন্তু এখন যা হচ্ছে তা যথেষ্ট নয়।
সবচেয়ে খারাপ যেটা হচ্ছে সেটা হলো, পরিষেবা খাতের চাকরির ক্ষেত্রে অনেক বেশি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হয়েছে, যা ঠিক হচ্ছে না।
রোবটগুলোকে উৎপাদন খাতের চেয়ে পরিষেবা খাতে বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে।
পিজার খামির যথাযথ স্থানে রাখা, হাসপাতালের পণ্য পরিবহন, প্রয়োজনীয় সামগ্রী বাছাইসহ নানা কাজে রোবট ব্যবহার করা হচ্ছে।
কারণ তারা অসুস্থ হয় না, ভাইরাসে সংক্রমিত হয় না কিংবা তারা হুট করে সন্তানের দিবাযত্ন কেন্দ্রে যাওয়ার মতো জরুরি অবস্থার সৃষ্টি করে না।
সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ৪৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠান কর্মী কমিয়ে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি স্থাপনে আগ্রহী।
সেজন্য সে ধরনের যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে দিয়েছেন তারা।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সবশেষ যে মহামারী ছিল, সেটি উৎপাদনকারীদের উৎপাদন বাড়াতে যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ করতে উৎসাহ দিয়েছিল।
কিন্তু এর ফলে কম দক্ষতার চাকরিগুলো ধ্বংস হয়েছিল।
তারা মনে করেন, কভিড-১৯ মহামারীও সেই রকম কিছু করতে যাচ্ছে।
তাই কর্মক্ষেত্রে রোবটের ব্যবহার নিয়ে তৈরি হওয়া শঙ্কাকে সঠিক বলে মনে করছেন তারা।
স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার প্রয়োগ বেড়ে গেলে, বিশেষ করে স্বল্প শিক্ষিত নারীরা কাজের অভাবে পড়বেন। এছাড়া কম দক্ষতাসম্পন্ন মানুষরাও কাজ হারাবে। মানুষের বদলে রোবট দিয়ে কাজ চালানো শুরু হয়ে গেলে নিঃসন্দেহে তারা কর্মীদের জন্য খারাপ ভবিষ্যৎ বয়ে আনবে। এপি অবলম্বনে