২০২৫-২৬ অর্থবছর

দেশীয় উৎপাদন কমায় সার আমদানি ১৪% বেশি, ব্যয় বেড়েছে ৪৯ শতাংশ

পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে দেশীয় সার কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে না পারায় আমদানিনির্ভরতা আরো বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সরকারের ব্যয়ে।

সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে সারের আমদানির পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার কারণে এ খাতে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪৯ শতাংশ, যা দাঁড়িয়েছে ৩৪ হাজার ৭১৪ কোটি টাকায়। এরই মধ্যে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে গ্যাস সরবরাহে নতুন সংকট তৈরি হওয়ায় দেশীয় উৎপাদন আরো অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আমদানি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে দেশে ইউরিয়া, ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি), ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) ও মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) মিলিয়ে মোট ৪৫ লাখ ৭২ হাজার টন সার আমদানি হয়েছে। এসব সারের কাস্টমস শুল্কায়িত মূল্য ৩৪ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪০ লাখ ১২ হাজার টন সার আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ২৩ হাজার ২৫২ কোটি টাকা। বাংলাদেশে এসব সারের প্রধান রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার।

বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশ থেকে ৯ লাখ ১২ হাজার টন ইউরিয়া সার আমদানিতে ব্যয় হয় ৫ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। তবে দেশের অভ্যন্তরে কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো) থেকে ডলারে মূল্য পরিশোধ করে কেনা ইউরিয়া এ হিসাবের অন্তর্ভুক্ত নয়। একই সময়ে ৬ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকায় ৮ লাখ ৭৯ হাজার টন টিএসপি, ৪ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকায় ১০ লাখ ৬০ হাজার টন এমওপি এবং ১৭ হাজার ৫২২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৭ লাখ ২১ হাজার টন ডিএপি সার আমদানি করা হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, চাষাবাদ ও খাদ্য উৎপাদন অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশকে সারের জন্য এখনো আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভর করতে হয়। ইউরিয়া সারের চাহিদা পূরণের মতো উৎপাদন সক্ষমতা দেশে থাকলেও পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে সেই সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বিদায়ী অর্থবছরে বিদেশ থেকে ৯ লাখ ১২ হাজার টন ইউরিয়া আমদানির পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানাগুলোয় প্রায় ১১ লাখ টন ইউরিয়া উৎপাদিত হয়েছে। একই সময়ে বহুজাতিক যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠান কাফকো আন্তর্জাতিক মুদ্রায় মূল্য পরিশোধের ভিত্তিতে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনকে (বিসিআইসি) আরো প্রায় ৫ লাখ ১৯ হাজার টন ইউরিয়া সরবরাহ করেছে। তবে সম্প্রতি পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় সার কারখানাটির উৎপাদনও থমকে গেছে। ফলে ইউরিয়ার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও গ্যাস সংকটের কারণে আমদানিনির্ভরতা কমানো যাচ্ছে না। অন্যদিকে ডিএপি ও টিএসপির দেশীয় উৎপাদন চাহিদার তুলনায় অনেক কম, আর এমওপির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পুরোপুরি আমদানিনির্ভর।

বিসিআইসির পরিচালক (বাণিজ্য, উৎপাদন ও গবেষণা) মো. মনিরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাসভিত্তিক সার কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনার জন্য যে পরিমাণ গ্যাস প্রয়োজন, তা পাওয়া যাচ্ছে না। তারপরও উৎপাদন সচল রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।’

আমদানি ব্যয় কমাতে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন বাড়বে, তখন স্বাভাবিকভাবেই আমদানি কমে আসবে। এছাড়া হরমুজ প্রণালি ঘিরে সৃষ্ট অস্থিরতা সার আমদানিতে প্রভাব ফেলেছে। এতে আমদানি ব্যয় বেড়েছে, তবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। এ কারণে বিকল্প উৎস থেকে সার আমদানির উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।’

সার আমদানির দায়িত্বে রয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান বিসিআইসি ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। ইউরিয়া সারের পুরো দায়িত্ব বিসিআইসির। আর টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি আমদানি করে বিএডিসি। সরকারি প্রতিষ্ঠান দুটি প্রয়োজন অনুযায়ী বছরের যেকোনো সময় সার আমদানি করতে পারে। তবে বেসরকারি আমদানিকারকদের নির্ধারিত সময়ে দরপত্রে অংশ নিয়ে নির্বাচিত হতে হয়। তারা বিশ্ববাজার থেকে সার আমদানি করলেও সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বেড়ে গেলে অতিরিক্ত ব্যয় ভর্তুকি হিসেবে বহন করে সরকার।

দেশে এখনো সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ইউরিয়া। বিশেষত বোরো ও আমন মৌসুমে এ সারের বার্ষিক চাহিদা ২৬-২৭ লাখ টন। জমি প্রস্তুতের সময় মূলত ডিএপি ও টিএসপি ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে ধান, শাকসবজি ও ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গুণগত মানোন্নয়নে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয় এমওপি।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ) আহমেদ ফয়সল ইমাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ের চাহিদা নিরূপণ করেই সার আমদানির পরিকল্পনা করা হয়। এখন পর্যন্ত বিসিআইসি, বিএডিসি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে যে পরিমাণ সার আমদানি হয়েছে, তা লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।’

তিনি আরো বলেন, ‘দেশীয় ইউরিয়া উৎপাদন পুরোপুরি নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। দেশের সার কারখানাগুলোয় প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে স্থানীয় উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। তবে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি থাকলে চাহিদা মেটাতে সার আমদানি বাড়ানো ছাড়া বিকল্প থাকে না।’

বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত সারের ৩০ শতাংশেরও বেশি ওমান উপসাগরের হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের সময় প্রণালিটিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক সার সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ জ্বালানি এবং এক-তৃতীয়াংশ সার পরিবাহিত হয়। ফলে এ রুটে অস্থিরতা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। এ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীন ও মিসরের মতো বিকল্প উৎস থেকে সার আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

আরও