সিএনএনের বিশ্লেষণ

যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি ও ঋণের চাপে অস্থির বৈশ্বিক বন্ডবাজার

জাপানে দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতি ছিল খুবই কম। এখন সেখানে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ১ সেপ্টেম্বর দেশটির ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের ইল্ড ৩ শতাংশ ছাড়িয়েছে। ১৯৯৬ সালের পর এ প্রথম এমন ঘটনা ঘটল।

বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে দেখা দিয়েছে সতর্ক সংকেত। এর কেন্দ্রস্থলে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডবাজার। ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে জ্বালানি তেল, পেট্রল, ডিজেল ও জেট ফুয়েলের দাম। এতে নতুন করে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে বন্ডবাজারে। বাড়ছে সরকারি ঋণের সুদহার। ফলে ভোক্তা, ব্যবসা ও সরকারের জন্য ঋণ নেয়া আরো ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। খবর সিএনএন।

যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড গত বুধবার প্রায় তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। এ ইল্ড মূলত যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ঋণ নেয়ার খরচের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। ইল্ড যত বাড়ে, সরকারের নতুন ঋণ নেয়ার খরচও তত বাড়ে। এর প্রভাব পড়ে পুরো অর্থনীতিতে।

বিশ্লেষক ম্যাট ইগান বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করছে। একদিকে ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ এরই মধ্যে ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে যুদ্ধের অতিরিক্ত ব্যয়। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ও সরকারি ঋণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

এর প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর বন্ডবাজারেও সুদহার বাড়ছে। জার্মানিতে ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের ইল্ড সম্প্রতি ২০১১ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। যুক্তরাজ্যে ৩০ বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড ১৯৯৮ সালের পর সর্বোচ্চ হয়েছে। জাপানেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

জাপানে দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতি ছিল খুবই কম। এখন সেখানে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ১ সেপ্টেম্বর দেশটির ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের ইল্ড ৩ শতাংশ ছাড়িয়েছে। ১৯৯৬ সালের পর এ প্রথম এমন ঘটনা ঘটল।

জ্বালানি থেকে মূল্যস্ফীতির চাপ: ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলছে। যুদ্ধ শুরুর সময় মার্কিন কর্মকর্তারা ধারণা দিয়েছিলেন, সংঘাত কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হবে। কিন্তু তা হয়নি। দীর্ঘস্থায়ী এ সংঘাত বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ অঞ্চল থেকে তেল সরবরাহে বাধা তৈরি করছে।

ফলে বিনিয়োগকারীদের জ্বালানি, মূল্যস্ফীতি ও বন্ডের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে হিসাব কষতে হচ্ছে। যদিও পারস্য উপসাগর থেকে তেলবাহী জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখার বিভিন্ন উদ্যোগ ও চীনের জ্বালানি তেল আমদানি কমানোর মতো পদক্ষেপ ক্ষতির মাত্রা কিছুটা কমিয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো বলছে, জ্বালানির বাজারে এর প্রভাব পুরোপুরি কাটেনি।

যুক্তরাষ্ট্রে গত মাসে গ্যাসোলিনের দাম ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল আগস্ট তৈরি করেছে বলে জানায় আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন বা এএএ। অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ডিজেলের দামও যুদ্ধ শুরুর পর ৫১ শতাংশ বেড়েছে।

ম্যাট ইগান বলছেন, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, জ্বালানির দাম তত বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বাড়লে বন্ডের ইল্ডও বাড়তে পারে। এতে পরিস্থিতি একটি চক্রের মতো হয়ে উঠছে।

বি রাইলি ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের প্রধান বাজার কৌশলবিদ আর্ট হোগান বলেন, ‘যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার বিশ্বাসযোগ্য কোনো পথ না পাওয়া পর্যন্ত এ পরিস্থিতি একটি বৃত্তাকার সমস্যায় পরিণত হতে পারে।’

এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের নজর এখন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) দিকে। চলতি মাসের শেষ দিকে ফেডের নীতিনির্ধারণী বৈঠক রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের একাংশ মনে করছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ফেডকে সুদহার বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হতে পারে।

যুদ্ধ মানেই বাড়তি ব্যয়: প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্ডবাজারে চাপ তৈরির আরেকটি বড় কারণ যুদ্ধের ব্যয়। যুদ্ধ পরিচালনা করতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। এ অর্থের বড় অংশই সরকারি বাজেটের বাইরে অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে যুক্ত হয়। ফলে সরকারকে আরো বেশি ঋণ নিতে হয়।

ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যয় বেড়েছে। এর অর্থ হলো সরকারের ঋণের প্রয়োজনও বাড়ছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্বের অন্যান্য বড় অর্থনীতিও প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াচ্ছে।

ইউরোপ, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াও বিভিন্ন বৈশ্বিক হুমকির কারণে সামরিক ব্যয় বাড়িয়েছে। জেপি মরগ্যান অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রধান বৈশ্বিক কৌশলবিদ ডেভিড কেলি বলেন, ‘বিশ্ব এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। এ ধরনের যুদ্ধ অত্যন্ত ব্যয়বহুল।’

বন্ডের ইল্ড বাড়লে কী হয়: বন্ডের ইল্ড বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ে অর্থনীতিতে। ইল্ড বাড়লে মূলধনের খরচ বেড়ে যায়। ফলে কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন কারখানা তৈরি বা ব্যবসা সম্প্রসারণে ঋণ নেয়া ব্যয়বহুল হয়। ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রেও ঋণের সুদ বেড়ে যায়। সরকারের ওপরও এর বড় প্রভাব পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ গত মাসে প্রথমবারের মতো ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এ বিশাল ঋণের ওপর সুদ পরিশোধের ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে।

মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সরকার ৯৩ হাজার ১০০ কোটি ডলার নিট সুদ পরিশোধ করেছে। একই সময় জাতীয় প্রতিরক্ষায় ব্যয় হয়েছে ৮০ হাজার ৪০০ কোটি ডলার।

এআই বিনিয়োগেও বাড়ছে ঋণের চাহিদা: সরকারের ঋণের সঙ্গে এখন নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি করেছে প্রযুক্তি খাত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির প্রসারে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডেটা সেন্টার নির্মাণে ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো।

এসব বড় বিনিয়োগের একটি অংশ বন্ডবাজারের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হচ্ছে। ফলে একই বাজারে সরকারি ও বেসরকারি দুই ধরনের ঋণের চাহিদা বাড়ছে। বন্ডবাজারের পরিস্থিতি সামাল দিতে গত মাসে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট একটি পদক্ষেপ নেন। তিনি ট্রেজারি বন্ডের বাইব্যাক অন্তত দ্বিগুণ করার পরিকল্পনার কথা জানান। এতে সাময়িকভাবে বাজার কিছুটা শান্ত হলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বন্ড বিক্রি ফের বেড়ে যায়।

আরও