এমসিসিআইয়ের আলোচনায় বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা

জ্বালানি সংকটে শিল্প টেকানোই চ্যালেঞ্জ সঠিক ব্যবস্থাপনায় অর্ধেক সমাধান

দেশের চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে শিল্প টিকিয়ে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা।

তাদের মতে, বর্তমান সংকট শুধু জ্বালানি সরবরাহের সমস্যা নয়, এটি অর্থনৈতিক সমস্যায় রূপ নিয়েছে। তবে বিদ্যমান জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ও পুরো ব্যবস্থাকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা গেলে সংকটের প্রায় ৫০ শতাংশ সমাধান করা সম্ভব। রাজধানীর গুলশানে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) কনফারেন্স হলে গতকাল এক গোলটেবিল আলোচনায় এ তথ্য উঠে আসে। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. এম মাসরুর রিয়াজের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি ছিলেন দ্য ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক ফজলুল হক। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন এমসিসিআইয়ের মহাসচিব ফারুক আহমেদ।

এছাড়া প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল, লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের সিইও ইকবাল চৌধুরী, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন এবং বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমইএ) সভাপতি ও মুন্নু সিরামিকের চেয়ারম্যান মইনুল ইসলাম।

আলোচনায় এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চললেও এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত সংকটে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখা।’

তিনি বলেন, ‘শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগের দিকে না গিয়ে সার্ভিস, নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অবকাঠামোর মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলোয় বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়টি নতুন দৃষ্টিতে দেখা উচিত। একই সঙ্গে শিল্পে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ বজায় রাখতে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর চাপ কমাতে এইচএফও (হেভি ফুয়েল তেল) ও কয়লাকে তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।’

এমসিসিআইয়ের মহাসচিব ফারুক আহমেদ জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে কারখানাগুলো তাদের উৎপাদন সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারছে না। এতে উৎপাদন হ্রাসের পাশাপাশি মানুষ চাকরি হারাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বর্তমান সংকট ও বিদ্যমান ব্যবস্থাকে সঠিকভাবে পরিচালনা এবং ব্যবস্থাপনা করা গেলে সমস্যার প্রায় ৫০ শতাংশ সমাধান করা সম্ভব।’

বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ‘সংকট সমাধানে কোথায় ভুল হয়েছে তা চিহ্নিত করে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। এ কারণে গ্যাসের সংকট আশঙ্কাজনক পর্যায়ে গেলে দেশ ব্ল্যাকআউটের দিকে যেতে পারে।’

তিনি জ্বালানি সংকট নিয়ে ‘ব্লেম গেম’ না করে সরকার ও ব্যবসায়ীদের একসঙ্গে বসে সমাধান খোঁজার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে অফশোর ও অনশোর—দুই ক্ষেত্রেই গ্যাস অনুসন্ধানে গুরুত্বারোপ করেন।

লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের সিইও ইকবাল চৌধুরী বলেন, ‘নতুন বিনিয়োগকারী আকর্ষণের আগে, দেশে যারা এরই মধ্যে বিনিয়োগ করেছেন তাদের সমস্যার সমাধান করা জরুরি। বিদ্যমান বিনিয়োগকারীরা সন্তুষ্ট ও সুরক্ষিত থাকলে নতুন বিনিয়োগ এমনিতেই আসবে।’

একটি দেশের ১০-২০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই জ্বালানি নীতি থাকা প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জ্বালানি কৌশল হতে হবে টেকসই, সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য। জ্বালানি সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের স্পষ্ট রূপরেখা না থাকলে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা নতুন করে বিনিয়োগ বা বিদ্যমান বিনিয়োগ ধরে রাখার বিষয়ে অনিশ্চয়তায় পড়বেন।’

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেনের মতে, বর্তমান গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট এখন আর শুধু জ্বালানি সরবরাহের সমস্যা নয়, এটি অর্থনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সঠিকভাবে গ্যাসের দাম নির্ধারণ না করাই এ সংকটের অন্যতম কারণ। পাঁচ বছর আগেই চাহিদার তুলনায় দেশে এফএসআরইউর (ভাসমান এলএনজি স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) ঘাটতি ছিল। এজন্য অন্তত তৃতীয় একটি এফএসআরইউ প্রয়োজন ছিল। একই সঙ্গে গ্যাসকেন্দ্রিক চিন্তা থেকে বের হয়ে বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে নজর দেয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন এ জ্বালানি বিশেষজ্ঞ।

সিরামিক, সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল কাঁচামাল গ্যাস উল্লেখ করে বিসিএমইএ সভাপতি মইনুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে দেশের অধিকাংশ সিরামিক কারখানায় গ্যাসের চরম সংকট চলছে। অনিশ্চিত সরবরাহের কারণে শিল্পের উৎপাদন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।’ তার মতে, সামগ্রিক শিল্প খাত ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গ্যাসের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে একসঙ্গে সরকারকে বোঝাতে হবে।

উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে ইস্টার্ন ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ শাহীন বলেন, ‘প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অনেক প্রতিষ্ঠান সময়মতো গ্যাস না পাওয়ায় নতুন বিনিয়োগ ও কারখানা সম্প্রসারণের গতি ধীর হয়ে পড়েছে।’ তিনি জানান, প্রায় ২০০টি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় চলতি বছরের জুলাইয়ে পণ্য বিক্রি বা বিক্রিজনিত আয় ১৪ শতাংশ কমেছে।

আরও