যশোরে উৎপাদিত ফুল, সবজি ও মাছের রেণু দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। কিন্তু কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সৃষ্ট অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে এ তিন খাতে। বিশেষ করে কারফিউ জারি থাকায় ক্রেতার অভাব দেখা দিয়েছে স্থানীয় আড়ত ও হাটগুলোয়।
ফুলের রাজধানী হিসেবে পরিচিত গদখালীর পাইকাররা কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে কিনে তা মোকামে নিয়ে আসছেন, কিন্তু কোনো ক্রেতা নেই। এতে খুচরা বাজারে ফুলের সরবরাহ কমে গেছে।
অন্যদিকে দেশের সর্ববৃহৎ সবজির মোকাম যশোরের বাড়িনগরের সাত মাইল। এখানকার চাষীরা দেশের চাহিদার ৬০ ভাগ পূরণ করে থাকেন। তবে গত কয়েকদিনে এ মোকামে সবজির সরবরাহ ছিল খুবই কম।
এছাড়া যান চলাচল না করায় বন্ধ হয়ে গেছে মাছের রেণু উৎপাদন। সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, এ তিন খাতে গত পাঁচদিনে যশোরে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
যশোর শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে ফুলের রাজধানী ঝিকরগাছার গদখালী ও পানিসরায় ১ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে ১১ ধরনের ফুল বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয়। যার সঙ্গে দুই ইউনিয়নের ছয় হাজার পরিবার জড়িত।
কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সৃষ্ট অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে ফুলের রাজধানীতেও। ফুল চাষের সঙ্গে সম্পৃক্তরা বলছেন, প্রতিদিন এখানে নষ্ট হচ্ছে অন্তত ২০ কোটি টাকার ফুল। খেত থেকে ফুল তুলে তা ভাগাড়ে ফেলে দিচ্ছেন চাষীরা।
সরজমিনে দেখা যায় পানিসরা, সৈয়দপাড়া, হাঁড়িয়াপাড়া, পটুয়াপাড়া ও ফুলকাননের মাঠে মাঠে শোভা পাচ্ছে দেশী-বিদেশী নানা জাতের ফুল। খেতজুড়ে রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাস, জারবেরা ও গোলাপ ফুটে আছে।
কারফিউর কারণে পরিবহন বন্ধ থাকায় সরবরাহ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছে। তাই চাষীরা খেত থেকে ফুল তুলে ফেলে দিচ্ছেন। তবে কেউ কেউ কোল্ড স্টোরেজে গোলাপ ফুল সংরক্ষণ করছেন।
পানিসরার ফুলচাষী আজিজুর রহমান সরদার জানান, এ বছর ছয় বিঘা জমিতে দেশীয় চায়না জাতের গোলাপের চাষ করেছেন তিনি। কিন্তু গ্রীষ্মে রেকর্ড তাপমাত্রার কারণে অধিকাংশ ফুল আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। মাঠে ভ্যাপসা গরম এখনো আছে। এতেই ফুলগুলো বাঁচিয়ে রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তার। এর মধ্যে দেশজুড়ে চলছে কারফিউ। যার প্রভাবে বিকিকিনি বন্ধ হয়ে গেছে। গত পাঁচদিনে তার প্রায় ৫০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে বলেও দাবি করেন।
যশোর ফুল উৎপাদন ও বিপণন সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম বলেন, ‘করোনা মহামারীর সময় এ অঞ্চলে ফুলের চাষ বড় ধরনের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিল। এরপরই আসে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের ধাক্কা। এসব ক্ষতি যখন কাটিয়ে উঠছিলেন চাষীরা, ঠিক তখনই কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে দেশজুড়ে তৈরি হয় অস্থিরতা, যার ব্যাপক প্রভাব পড়েছে এ খাতে।’
তিনি আরো জানান, প্রতিদিন এখানে প্রায় ২০-২২ কোটি টাকার ফুল বেচাকেনা হয়ে থাকে। কিন্তু চলমান অস্থিরতার প্রভাবে গত পাঁচদিনে অন্তত শতকোটি টাকার বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন ফুলচাষী ও ব্যবসায়ীরা।
এদিকে যশোরের পাইকাররা কম দামে চাষীদের কাছ থেকে সবজি কিনেও পরিবহনের অভাবে তা মোকামে নিতে পারছেন না।
বাড়িনগরের সাতমাইল সবজির মোকামের ইজারাদার আব্দুস সোবহান বলেন, ‘বাইরের পাইকাররা আসছেন না। মাঠ থেকে কৃষকরাও সবজি নিয়ে মোকামে আসছেন না।’
তিনি আরো বলেন, ‘আগে এখান থেকে এক ট্রাক সবজি ঢাকায় পাঠাতে ২২ হাজার টাকা খরচ হতো। কিন্তু এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ হাজার টাকা, যার প্রভাব পড়েছে পুরো বাজার ব্যবস্থায়।’
দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ রেণুর চাহিদা পূরণ করে থাকে যশোরের চাঁচড়া হ্যাচারি পল্লী। তবে চলমান অস্থিরতার কারণে এখানে পোনা উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
হ্যাচারি মালিক সমিতির সভাপতি ফিরোজ খান বলেন, ‘পরিবহন ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় বাইরের জেলাগুলোয় পোনা সরবরাহ করা যাচ্ছে না। গত কয়েকদিনে চাহিদা না থাকায় আপাতত উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে।’
তিনি দাবি করেন, গত পাঁচদিনে মাছের রেণু উৎপাদন খাতে প্রায় ১৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।