বাঙ্কারিং নীতিমালায় আসছে বড় পরিবর্তন

মেরিন ফুয়েল আমদানির সুযোগ পাচ্ছে বেসরকারি খাত

দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জাহাজে জ্বালানি সরবরাহের (বাঙ্কারিং) লক্ষ্যে বিদ্যমান বাঙ্কারিং নীতিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

প্রস্তাবিত ‘বাঙ্কারিং নীতিমালা ২০২৬’-এ লাইসেন্সিং ব্যবস্থা, মেরিন ফুয়েল আমদানি, পরিবেশ সুরক্ষা, ডিজিটাল নজরদারি, আন্তর্জাতিক মানের জ্বালানি সরবরাহ ও বিদেশী বিনিয়োগসহ একাধিক নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এতে যোগ্যতার শর্ত পূরণকারী দেশী-বিদেশী কিংবা যৌথ বিনিয়োগভিত্তিক যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য বাঙ্কার (মেরিন ফুয়েল) সরবরাহকারী হিসেবে আবেদনের সুযোগ রাখা হচ্ছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ কর্তৃক প্রস্তুতকৃত তুলনামূলক খসড়ায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, সমুদ্রবন্দরগুলোর কৌশলগত গুরুত্ব, আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আন্তর্জাতিক মানের বাঙ্কারিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার আয় বাড়ানো, বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বাঙ্কারিং হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।

বাঙ্কারিং অর্থ জাহাজের নিজস্ব ব্যবহারের জন্য জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা। আর বাঙ্কার হলো জাহাজের নিজস্ব ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল। বর্তমানে দেশের জলসীমায় সমুদ্রগামী জাহাজে লো-সালফার মেরিন ফুয়েল (এলএসএফও) সরবরাহ কার্যক্রম বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) আওতাধীন ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এ জ্বালানি আমদানির একক দায়িত্বও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির। আন্তর্জাতিক চুক্তি ও উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ থেকে মেরিন ফুয়েল আমদানি করে বিপিসি। এরপর তিনটি বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানির মাধ্যমে চট্টগ্রাম এবং মোংলা বন্দরে অবস্থানরত দেশী-বিদেশী জাহাজের জন্য জ্বালানি সরবরাহ করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে বিপিসির অনুমোদিত ডিলাররা নিজস্ব বার্জের মাধ্যমে সমুদ্রগামী জাহাজে সরবরাহ করেন। তবে প্রস্তাবিত নীতিমালায় বিপিসি নিজস্ব উদ্যোগে মেরিন ফুয়েল আমদানির পরিবর্তে সংস্থাটির আওতাধীন বিপণন কোম্পানি বা অন্য কোনো দেশী-বিদেশী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শর্তসাপেক্ষে আমদানি করতে পারবে।

এমজেএল বাংলাদেশ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ ওশান গোয়িং শিপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছে, সেভাবেই জাহাজে জ্বালানি সরবরাহ করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকলে বাংলাদেশ এ খাতে প্রতিযোগিতামূলক কোনো সুবিধাই পাবে না। সমুদ্রগামী জাহাজে কী ধরনের জ্বালানি ব্যবহার হবে, তার মানদণ্ডও আইএমও নির্ধারণ করে দিয়েছে। তবে বর্তমানে দেশে যে বাঙ্কারিং ব্যবস্থা চালু রয়েছে তার কোনো মানদণ্ডই নেই। সরকার এখন মনে করছে, বিপিসির পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে যুক্ত করা গেলে এ খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব।’ প্রস্তাবিত নীতিমালা কার্যকর হলে বাংলাদেশে সমুদ্রগামী জাহাজের জন্য একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে বলেও জানান তিনি।

প্রথমবারের মতো বেসরকারি খাতকে মেরিন ফুয়েল আমদানির সুযোগ দেয়া প্রসঙ্গে বাঙ্কার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযোগ, বাজার উন্মুক্ত করার কথা বলা হলেও খসড়ায় এমন অবকাঠামো ও আর্থিক শর্ত রাখা হয়েছে, যা কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান পূরণ করতে পারবে। ফলে প্রতিযোগিতা বাড়ার পরিবর্তে পুরো বাজার গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশ বাঙ্কার সাপ্লায়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আবদুল মান্নান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার জ্বালানি আমদানির দায়িত্ব বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে চাচ্ছে। তবে আমদানি পুরোপুরি উন্মুক্ত করার আগে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও সক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি। নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানকে আমদানির সুযোগ দেয়া হলে তাদের শিপ টু শিপ (এসটিএস) অপারেশনের বাস্তব অভিজ্ঞতা নাও থাকতে পারে। অথচ বর্তমানে এ খাতে যারা কাজ করছে, তাদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা, নিজস্ব জেটি, ভেসেল ও ল্যাবরেটরি সুবিধা রয়েছে। আর যেসব অবকাঠামোগত ঘাটতি আছে, সেগুলো সহজ করে ও বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রস্তুতির জন্য আরো সময় দিয়ে নীতিমালা বাস্তবায়ন করলে সেটিই বেশি যৌক্তিক হবে।’

প্রস্তাবিত নীতিমালাটি আরো পর্যালোচনা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ডিলারশিপভিত্তিক বিপণন ব্যবস্থা চালু রয়েছে। নতুন নীতিমালায় আমদানিকারকই সরাসরি সরবরাহকারী হবে। সেক্ষেত্রে বিদ্যমান নীতিমালা সংশোধনের পরিবর্তে সম্পূর্ণ নতুন নীতিমালা আনার প্রয়োজনীয়তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। আমরা এ খাতের প্রধান অংশীজন। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা আমাদের মতামত চেয়েছে। আমরা শিগগিরই যৌক্তিক ও বাস্তবভিত্তিক সুপারিশ সরকারের কাছে তুলে ধরব।’

প্রস্তাবিত নীতিমালায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের একটি হচ্ছে মেরিন ফুয়েল আমদানির নতুন কাঠামো। দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ সালফার কনটেন্টযুক্ত ফার্নেস অয়েলকে মেরিন ফুয়েল হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। বিদ্যমান নীতিমালায় এ বিষয়ে স্পষ্ট বিধান না থাকলেও নতুন খসড়ায় বলা হয়েছে, বিপিসির বিপণন কোম্পানির পাশাপাশি নির্ধারিত শর্ত পূরণকারী দেশী-বিদেশী প্রতিষ্ঠানও পৃথক অনুমতি নিয়ে আমদানি করতে পারবে। এজন্য আলাদা ইমপোর্ট পারমিশন নিতে হবে এবং আর্থিক সক্ষমতা, পরিবেশগত সক্ষমতার শর্ত পূরণ করতে হবে।

খসড়ায় জ্বালানি তেলের মান নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগারের ফুয়েল কোয়ালিটি সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে জ্বালানির গ্রেড, ঘনত্ব, সালফারের পরিমাণ, ফ্ল্যাশ পয়েন্ট, পানি, ব্যাচ নম্বর ও পরীক্ষার তারিখ উল্লেখ থাকতে হবে। একই সঙ্গে নমুনা সংরক্ষণ, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী পরীক্ষা এবং জ্বালানির গুণগত মান বজায় রাখার দায়িত্বও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তাবে।

নীতিমালায় দেশী-বিদেশী ও যৌথ বিনিয়োগভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বাঙ্কার সরবরাহকারী হিসেবে লাইসেন্স পাওয়ার সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি সব লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য ডিজিটাল রেজিস্ট্রিতে সংরক্ষণ এবং বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এছাড়া বাঙ্কারিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত বার্জ, ট্যাংকার ও অন্যান্য নৌযানের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত মান অনুসরণের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। জাহাজগুলোর প্রয়োজনীয় ফিটনেস, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, দূষণ প্রতিরোধ সরঞ্জাম, ট্যাংক ক্যালিব্রেশন ব্যবস্থা এবং যোগাযোগ সরঞ্জাম থাকতে হবে। এছাড়া মেরিন ফুয়েল আমদানিকারকদের নিজস্ব সংরক্ষণাগার, পরীক্ষাগার ও জেটি সুবিধার বিষয়েও নতুন শর্ত যুক্ত করা হয়েছে।

লাইসেন্স গ্রহণের প্রক্রিয়াও ডিজিটাল করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে কোম্পানি নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন, ভ্যাট নিবন্ধন, আর্থিক বিবরণী, পরিবেশগত ছাড়পত্র, নিরাপত্তা পরিকল্পনা, অয়েল স্পিল রেসপন্স প্ল্যান এবং বীমা কাভারেজসহ বিস্তৃত তথ্য জমা দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তির বিধানও রাখা হয়েছে।

বাঙ্কারিং কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনতে ডিজিটাল রিপোর্টিং ব্যবস্থাও চালুর প্রস্তাব রয়েছে। লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরবরাহকৃত জ্বালানির ধরন, জাহাজের সংখ্যা, বৈদেশিক মুদ্রা আয়, শিপ টু শিপ অপারেশন, বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ, পরিবেশগত ঘটনা এবং অন্যান্য তথ্য নিয়মিত ডিজিটাল প্লাটফর্মে জমা দিতে হবে। এসব তথ্য কমপক্ষে পাঁচ বছর সংরক্ষণ করতে হবে।

পরিবেশ সুরক্ষাকে নতুন নীতিমালায় বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বাঙ্কারিং কার্যক্রমে জ্বালানি তেল ছড়িয়ে পড়া বা অন্য কোনো দূষণের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান দায়ী থাকবে। এজন্য দূষণ দায়বদ্ধতা বীমা (পলিউশন লায়াবিলিটি ইন্স্যুরেন্স) বা পিঅ্যান্ডআই কাভারেজ রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি দূষণ মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত জনবল রাখার বিধানও সংযোজন করা হয়েছে। এছাড়া বাঙ্কারিং কার্যক্রমে কোনো বিরোধ দেখা দিলে তা নিষ্পত্তির জন্য বাঙ্কারিং ডিসপিউট রেজল্যুশন কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। বাঙ্কারের পরিমাণ বা মান নিয়ে বিরোধ হলে স্বাধীন সার্ভেয়ার নিয়োগের সুযোগও রাখা হয়েছে।

নীতিমালার খসড়ায় আরো বলা হয়েছে, যোগ্যতার শর্ত পূরণকারী যেকোনো দেশী-বিদেশী ও যৌথ বিনিয়োগভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বাঙ্কার সরবরাহকারী হিসেবে আবেদন করতে পারবে। লাইসেন্সের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। তবে নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও আর্থিক সক্ষমতার শর্ত লঙ্ঘন, প্রতারণা কিংবা নিম্নমানের জ্বালানি সরবরাহের অভিযোগ প্রমাণিত হলে লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করা যাবে।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাঙ্কারিংয়ের ক্ষেত্রে আইএমওর দায়বদ্ধতা ও পরিবেশগত মানদণ্ড অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। সমুদ্রাঞ্চলে জ্বালানিতে সালফারের সর্বোচ্চ মাত্রা নির্ধারণ করে দিয়ে আগে ব্যবহৃত উচ্চ সালফারযুক্ত ফুয়েলের পরিবর্তে এখন ভেরি লো সালফার ফুয়েল অয়েল (ভিএলএসএফও) এবং আল্ট্রা লো সালফার ডিজেল (ইউএলএসডি) ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। কার্বন নিঃসরণ ও গ্রিনহাউজ গ্যাস কমাতে আইএমও ধাপে ধাপে আরো কঠোর পরিবেশগত মানদণ্ড বাস্তবায়ন করবে।’ এ প্রেক্ষাপটে বাঙ্কারিং খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে সরকারকে গুরুত্বের সঙ্গে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আরও