কেজিতে বেড়েছে ৫০-১৫০ টাকা

পাইকারিতে বেড়েছে সব ধরনের শুকনো ফলের দাম

দেশে প্রতি বছর শীতকালে বেড়ে যায় শুকনো ফলের চাহিদা। এ জাতীয় পণ্যের সিংহভাগই আমদানিনির্ভর হওয়ায় বর্তমানে সরবরাহ সংকটে পড়েছে শুকনো ফলের বাজার।

দেশে প্রতি বছর শীতকালে বেড়ে যায় শুকনো ফলের চাহিদা। জাতীয় পণ্যের সিংহভাগই আমদানিনির্ভর হওয়ায় বর্তমানে সরবরাহ সংকটে পড়েছে শুকনো ফলের বাজার। দেশে চলমান ডলার সংকট টাকার বিপরীতে ডলার শক্তিশালী হওয়ায় জাতীয় পণ্যের আমদানি কমেছে। পাশাপাশি শুল্ক ফিও বেড়ে গেছে। সব মিলিয়ে শুকনো ফলের বাজারে চলছে অস্থিরতা।

বাজার তথ্য বলছে, রমজান ঈদুল ফিতরের সময়, কোরবানির ঈদ শীতকালীন নানা উৎসবের সময় শুকনো ফলের চাহিদা শীর্ষে ওঠে। দেশে শীত মৌসুম আসতে শুরু করায় এরই মধ্যে কিসমিস, কাঠবাদাম, কাজুবাদাম, চীনাবাদাম, মিষ্টি আলু বোখারাসহ বিভিন্ন ধরনের শুকনো ফলের চাহিদা বেড়ে গেছে। কিন্তু ঋণপত্র বা এলসি জটিলতার কারণে আমদানি সীমিত হয়ে আসায় সরবরাহ কমেছে বাজারে। এতে পণ্যভেদে কেজিপ্রতি ৫০-১৫০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম আরো বাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুকনো ফলের মধ্যে একমাত্র চীনা বাদামই দেশে উৎপাদন হয়। তবে গত এক দশকে চীনা বাদামের নানামুখী ব্যবহার বাড়ার কারণে দেশীয় উৎপাদন সত্ত্বেও আমদানি করতে হয় বিশ্ববাজার থেকে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে কিছু পরিমাণ কাজু বাদাম উৎপাদন হলেও তা দেশীয় চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। সব মিলিয়ে খাতটির অধিকাংশই আমদানিনির্ভর।

আমদানিকারকরা বলছেন, দেশে আমদানীকৃত চীনা বাদামের সিংহভাগই আসে পাশ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে। অন্যান্য শুকনো ফল আসে চীন, থাইল্যান্ডসহ পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে। প্রায় বছরখানেক ধরে দেশে ডলার সংকট থাকায় জরুরি নয় এমন পণ্যের বিপরীতে এলসি খোলার সংখ্যা সীমিত হয়ে এসেছে। ফলে শুকনো ফলের মতো বিলাসী পণ্যের দাম অতীতের যেকোনো সময়ের রেকর্ড ভেঙেছে।

দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে পাইকারি পর্যায়ে প্রতি কেজি কিসমিস বিক্রি হচ্ছে ৪৩০-৪৩৫ টাকা দরে। এক মাসের মধ্যে পণ্যটির দাম বেড়েছে ৬০-৭০ টাকা। কাঠবাদামের দাম কেজিপ্রতি ১৩০-১৪০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৯০০ টাকায়। এছাড়া পেস্তা বাদামের দাম প্রতি কেজিতে ২০-৩০ টাকা বেড়ে হাজার ৬০০ টাকা, কাজু বাদামের দাম ১৮০-২০০ টাকা বেড়ে হাজার ১৮০ টাকা, টক আলু বোখরা ৬০ টাকা বেড়ে ৪৪০ টাকায় মিষ্টি আলু বোখারা ৪০-৪৫ টাকা বেড়ে কেজিপ্রতি ৪৩০-৪৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

আর দেশে উৎপাদিত প্রতি কেজি খোসাহীন চীনা বাদামের দাম -১০ টাকা বেড়ে ১৫৮-১৬০ টাকায়, আস্ত বা খোসাযুক্ত চীনা বাদামের দামও একই পরিমাণ বেড়ে কেজিপ্রতি ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এসব পণ্যের চাহিদা বাড়তে থাকলেও আমদানি বা উৎপাদনের পরিমাণ এখনো যথেষ্ট কম। এমন অবস্থায় ডলার সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে কিংবা দেশে উৎপাদন না বাড়ালে আগামীতে এসব পণ্যের দাম আরো অস্থিতিশীল হয়ে ওঠার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

স্বাভাবিকভাবেই প্রতি বছর শীত মৌসুমে দেশে পারিবারিক, সামাজিক ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে যায়। বছর নির্বাচনী বছর হওয়ায় অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিমাণ গত কয়েক বছরের চেয়ে বাড়বে। ফলে রান্নার কাজে মসলা হিসেবে ব্যবহৃত এসব শুকনো ফলের চাহিদা কয়েক গুণ বাড়বে বলে আশা বিক্রেতাদের।

অন্যান্য বছর শীত মৌসুমের আগেই আমদানি বাড়িয়ে দিতেন ব্যবসায়ীরা। আগাম টাকা জমা দিয়ে এলসি খোলার বাধ্যবাধকতা, আগাম টাকা দিয়েও ডলার সংকটে এসব পণ্যের এলসি খুলতে ব্যাংকের অনীহার কারণে আমদানির পরিমাণ সীমিত হয়ে গেছে। এসব কারণে বাজার সরবরাহ ঘাটতিতে থাকায় অব্যাহত দাম বাড়ছে পণ্যগুলোর।

খাতুনগঞ্জের শুকনো ফল বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান মেসার্স খুইল্লা মিয়া সওদাগরের স্বত্বাধিকারী মো. ইউনুছ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সর্বশেষ বাজেটে বিলাসী পণ্য হিসেবে ড্রাই ফ্রুটসের (শুকনো ফল) শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে ডলার সংকট ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সব ধরনের ড্রাই ফ্রুটস আমদানিতে প্রভাব পড়েছে। শীত মৌসুমে চাহিদা একই থাকলেও বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় দাম আরো বেড়ে যাবে। এসব কারণে আমদানিনির্ভর শুকনো ফলের বাজার অস্থিতিশীলতার দিকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন তিনি।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আপ্যায়নের অংশ হিসেবে পোলাও, বিরিয়ানিসহ সব ধরনের খাবারে শুকনো ফলের ব্যবহার রয়েছে। তাছাড়া মিষ্টি জাতীয় খাবার তৈরি, প্যাকেটজাত ভোগ্য পণ্যসহ হোটেল-রেস্টুরেন্টে শুকনো ফলের ব্যবহার বাড়ছে। এসব চাহিদার ৯০ শতাংশ শুকনো ফলই আমদানিনির্ভর হওয়ায় সংকটকালে পণ্যগুলোর দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাজারে এসব পণ্যের দাম না বাড়লেও দেশীয় সংকটের কারণে অভ্যন্তরীণ বাজারে অস্বাভাবিক দাম বাড়ছে বলে মনে করছেন তারা।

আরও