মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের জেরে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এতে জ্বালানি পণ্যটির দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় এশীয় দেশগুলো বিকল্প হিসেবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে। খরচ কমাতে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ সংস্থাগুলো এখন এলএনজির বদলে কয়লার ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। খবর রয়টার্স।
শিল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলএনজি পরিবহন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি রফতানিকারক দেশ কাতার বর্তমানে সরবরাহ স্থগিত রেখেছে। এতে মাত্র চার বছরের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো বড় ধরনের সরবরাহ সংকটের মুখে পড়েছে বিশ্ববাজার। এশিয়ায় স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বেড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
জ্বালানির এ উচ্চমূল্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ মার্চে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আমদানি বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, পাকিস্তান বর্তমানে দেশী উৎস ও সৌরবিদ্যুতের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। দেশটির বিদ্যুৎমন্ত্রী আওয়াইস লেঘারি জানান, এলএনজিভিত্তিক উৎপাদন কমিয়ে এখন স্থানীয় কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অফ-পিক সময়ে অর্থাৎ যখন বিদ্যুতের চাহিদা তুলনামূলক কম থাকে, তখন বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ফিলিপাইন এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে কয়লার ব্যবহার বাড়াচ্ছে। ভিয়েতনামের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ইভিএন বর্তমানে কয়লা সরবরাহের বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে। থাইল্যান্ডও এলএনজি মজুদ ধরে রাখতে সবচেয়ে বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অন্যদিকে, পূর্ব এশিয়ায় দক্ষিণ কোরিয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর থেকে সব ধরনের বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি জাপানও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চালু রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
গ্লোবাল এনার্জি মনিটরের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এলএনজির উচ্চমূল্য ও সরবরাহ সংকটের কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রায় ১০ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের অবকাঠামো বিনিয়োগ এখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বাংলাদেশের সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজিজ খান এ প্রসঙ্গে রয়টার্সকে বলেন, ‘জ্বালানির বাড়তি দাম সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়া অত্যন্ত কঠিন। এটি দরিদ্র দেশগুলোর অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে।’
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির বিশ্লেষক লুকাস স্মিট জানান, এ সংঘাত ২০২৬ সাল নাগাদ এশিয়ায় এলএনজির চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দেবে। সংস্থাটি এশিয়ায় বার্ষিক এলএনজি আমদানির পূর্বাভাস ১ কোটি ২৪ লাখ টন থেকে কমিয়ে ৫০ লাখ টনে নামিয়ে এনেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির এ অস্থিরতা ভবিষ্যতে দেশগুলোকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে আরো বেশি আগ্রহী করে তুলতে পারে।