মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছে এশিয়ার দেশগুলো

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সাম্প্রতিক উত্তেজনা কমার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আগের জায়গায় ফিরে এসেছে।

তা সত্ত্বেও ঝুঁকি এড়াতে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি তেলের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা স্থায়ীভাবে কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এশিয়ার শীর্ষস্থানীয় আমদানিকারক দেশগুলো। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম কমলেও জাপান, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বড় ক্রেতারা এখন আর একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর ভরসা রাখতে পারছে না। ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল কেনার প্রচলিত ধারায় একটি বড় পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। খবর নিক্কেই এশিয়া।

বাজারের তথ্যানুযায়ী, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর জ্বালানি তেলের বাজার কিছুটা শান্ত হয়। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল ৭২ ডলারে নেমে আসে এবং মার্কিন বাজার আদর্শ ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়টের (ডব্লিউটিআই) দাম কমে ৬৮ ডলারের ঘরে পৌঁছায়। গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আবার স্বাভাবিকভাবে জ্বালানি তেল পরিবহন শুরু হবে, এমন আশায় দাম কমলেও ক্রেতা দেশগুলোর কৌশলগত সিদ্ধান্তে কোনো পরিবর্তন আসছে না।

সিঙ্গাপুরের একজন জ্বালানি ব্যবসায়ী জানান, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে এ অঞ্চলের তেল পরিবহনে এখন বীমা খরচ অনেক বেড়ে গেছে। ফলে ঝুঁকি ও বাড়তি খরচ এড়াতে মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এখন ক্রেতাদের কাছে আকর্ষণ হারাচ্ছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে বিক্রি সচল রাখতে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি তেল হয়তো সামনের দিনে আরো কম দামে বা ডিসকাউন্টে ছাড়তে হতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে এশিয়ার দেশগুলো বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহের চেষ্টা জোরদার করেছে। উদাহরণ হিসেবে জাপানের কথা বলা যায়। ২০২৫ সালেও জাপানের মোট জ্বালানি তেল আমদানির ৯৩ শতাংশ আসত হরমুজ প্রণালি দিয়ে। কিন্তু দেশটি জানিয়েছে, জুলাইয়ের মধ্যে তারা বিকল্প পথ ব্যবহার করে শতভাগ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জাপান এখন নিজেদের শোধনাগারগুলোকে এমনভাবে আধুনিকায়ন করছে, যাতে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তেল সহজে প্রক্রিয়াজাত করা যায়।

একইভাবে ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়াও মধ্যপ্রাচ্যের ওপর থেকে নিজেদের নির্ভরতা কমাতে কাজ করছে। এশিয়ার বাজারের এ পরিবর্তন দেখে বিশ্বখ্যাত তেল কোম্পানিগুলোও এখন আফ্রিকার নাইজেরিয়া কিংবা কানাডার মতো ভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের নতুন তেল ও গ্যাস প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।

এদিকে ক্রেতাদের এ অনীহার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রতীক হিসেবে পরিচিত দুবাই ক্রুডের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের অন্য তেলের চেয়ে অনেক দ্রুতগতিতে কমছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, তেলের বাজারে ঐতিহ্যবাহী তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেকের একক আধিপত্যও এখন সংকটে। কোটা নিয়ে বিরোধের জেরে গত মে মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এ জোট থেকে বের হয়ে গেছে এবং ইরানও জোট ছাড়ার কথা ভাবছে। সব মিলিয়ে দাম কমলেও মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজারে আগের সেই সুদিন আর সহজে ফিরছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আরও