এ লক্ষ্য অর্জনে বাণিজ্যিক সংহতি জোরদার, দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা বিমসটেক এফটিএ (মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল) বাস্তবায়ন, আঞ্চলিক সংযোগ সম্প্রসারণ এবং সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদ, কূটনীতিক ও নীতিনির্ধারকরা। তাদের মতে, এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিতে এখন ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সদস্য দেশগুলোর মধ্যে কার্যকর সহযোগিতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) কার্যালয়ে গতকাল এক সেমিনারে বক্তাদের আলোচনায় এসব কথা উঠে আসে। ‘থ্রি ডিকেডস অব বিমসটেক অ্যাডভান্সিং রিজিওনাল কো-অপারেশন ফর শেয়ারড প্রসপারিটি’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের আয়োজক বিআইআইএসএস। সেমিনারে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম প্রধান অতিথি ও বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের (বিমসটেক) মহাসচিব ইন্দ্র মণি পান্ডে বিশেষ অতিথি ছিলেন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) সভাপতি এএনএম মুনিরুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এএসএম রিদওয়ানুর রহমান। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বিআইআইএসএসের গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবির। এছাড়া সেমিনারে প্যানেলিস্ট হিসেবে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. রাশেদুজ্জামান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘তিন দশকের পথচলায় বিমসটেক দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে সংযুক্তকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক প্লাটফর্মে পরিণত হয়েছে। এ অঞ্চলে বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে কার্যকর আঞ্চলিক সহযোগিতা আর বিলাসিতা নয়, বরং অপরিহার্য।’
তিনি বলেন, ‘‘‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’’ পররাষ্ট্রনীতির আলোকে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থই কূটনীতির মূল নির্দেশক। তবে এর মানে বাংলাদেশ একা নয়; বরং শান্তিপূর্ণ, সংযুক্ত ও সমৃদ্ধ একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই দেশের সর্বোত্তম স্বার্থ নিশ্চিত করা সম্ভব।’
শামা ওবায়েদ ইসলাম আরো বলেন, ‘বাস্তবায়ন, অন্তর্ভুক্তি ও ফলাফল—এ তিন নীতির ওপর পরিচালিত হবে বাংলাদেশের চেয়ারম্যানশিপ। তবে দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বিমসটেক এফটিএর প্রয়োজনীয় চুক্তিগুলো সম্পন্ন হয়নি। এ বিষয়ে ঐকমত্য গড়ে তুলে আলোচনায় নতুন গতি আনতে বাংলাদেশ কাজ করবে।’ একই সঙ্গে পরিবহন সংযোগবিষয়ক মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন, উপকূলীয় নৌ-পরিবহন চুক্তি, জ্বালানি ও ডিজিটাল সংযোগ সম্প্রসারণ, ব্লু ইকোনমির টেকসই ব্যবহার এবং আঞ্চলিক ভ্যালু চেইন শক্তিশালী করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
বিশেষ অতিথি বিমসটেক মহাসচিব ইন্দ্র মণি পান্ডে বলেন, ‘বাণিজ্য ও বিনিয়োগ খাতে পৃথক ওয়ার্কিং গ্রুপ বিভিন্ন চুক্তি নিয়ে কাজ করছে এবং কয়েকটি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।’ শিগগিরই কিছু চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার আশা প্রকাশ করেন তিনি। পাশাপাশি বাংলাদেশের নেতৃত্বে সদস্য দেশগুলোর বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থাগুলোর জন্য একটি প্লাটফর্ম তৈরির প্রস্তাবের কথাও তুলে ধরেন। তার মতে, প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এরই মধ্যে গড়ে উঠেছে।
বিআইপিএসএস প্রেসিডেন্ট এএনএম মুনিরুজ্জামান বলেন, ‘বিমসটেক একটি সম্ভাবনাময় প্লাটফর্ম। এটি বাংলাদেশের জন্য বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি ও সামুদ্রিক সহযোগিতার আঞ্চলিক হাবে পরিণত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।’ তিনি এক্ষেত্রে সার্ক ও বিমসটেককে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক প্লাটফর্ম হিসেবে ব্যবহারের আহ্বান জানান।
বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এএসএম রিদওয়ানুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ বর্তমানে বিমসটেকের চেয়ারম্যান ও সচিবালয়ের আয়োজক দেশ হওয়ায় সংস্থাটিকে “আকাঙ্ক্ষামূলক আঞ্চলিকতা” থেকে কার্যকর, কৌশলগত ও অর্থনৈতিক জোটে রূপান্তরের দায়িত্ব ও সুযোগ তৈরি হয়েছে।’
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় বিআইআইএসএসের গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবির বলেন, ‘২০০৪ সালে বিমসটেক এফটিএর ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি স্বাক্ষর হলেও এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। শুধু বিধিবিধান বিনিময় যথেষ্ট নয়; পরিচালনাগত আলোচনা, কারিগরি সহায়তা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর সমাধান ছাড়া এফটিএ স্বাক্ষর সম্ভব নয়।’ সদস্য দেশগুলোর অর্থনীতির আকারের পার্থক্য, ভৌত ও নিয়ন্ত্রক প্রতিবন্ধকতা, তথ্যের ঘাটতি এবং দুর্বল আঞ্চলিক বাণিজ্যিক সংযোগও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ড. মাহফুজ কবির আরো বলেন, ‘বিমসটেক-ভুক্ত দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ পণ্য বাণিজ্য মোট বাণিজ্যের মাত্র ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। অথচ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য সম্ভাবনা রয়েছে। আন্তঃসীমান্ত প্রতিবন্ধকতা, লজিস্টিকস, মানদণ্ড, স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি ব্যবস্থা এবং বন্দরের সীমিত প্রবেশ সমস্যার সমাধান করা গেলে এটি বাস্তবায়ন সম্ভব।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. রাশেদুজ্জামান বলেন, ‘সংযোগ আঞ্চলিক অগ্রগতির চালিকাশক্তি হলেও এর ভিত্তি নিরাপত্তা।’ তার মতে, বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক সুযোগ কাজে লাগাতে নিরাপত্তা ও সহযোগিতাকে সমান্তরালভাবে এগিয়ে নিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম আঞ্চলিক সহযোগিতা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির পারস্পরিক আন্তঃক্রিয়ার ফল বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘অবকাঠামো ও নিরাপত্তার পাশাপাশি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, ব্যবসায়িক যোগাযোগ এবং জনগণের মধ্যে সংযোগও শক্তিশালী করতে হবে।’ একই সঙ্গে সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি গবেষণা সংস্থা এবং রাষ্ট্রের বাইরের অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তি আরো সুদৃঢ় করার আহ্বান জানান তিনি।