আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের পূর্বাভাস

দুই বছরের মধ্যে স্বর্ণের দাম পৌঁছবে নতুন উচ্চতায়

লন্ডনে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস আয়োজিত মূল্যবান ধাতুবিষয়ক সম্মেলনে গত বুধবার স্বর্ণের ভবিষ্যৎ দাম নিয়ে পূর্বাভাস দেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা। ট্রয় অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের তহবিল ব্যবস্থাপক শার্লট ইয়ং বলেন, ‘‌১২-১৮ মাসের মধ্যে স্বর্ণের দাম নতুন রেকর্ড গড়তে পারে।’

আন্তর্জাতিক বাজারে দুই বছরের মধ্যে স্বর্ণের দাম নতুন রেকর্ড গড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আর্থিক বাজারের অনিশ্চয়তা এবং ডলারের ওপর আস্থা কমে আসায় স্বর্ণের চাহিদা বাড়বে বলে মনে করছেন তারা। পাশাপাশি মূল্যবান ধাতুটির মজুদ বাড়ছে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকেও। গত সেপ্টেম্বরে ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার পরিমাণ প্রায় দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস (এফটি)।

আন্তর্জাতিক বাজারে কয়েক মাস ধরে ওঠানামা করছে স্বর্ণের দাম। ধাতুটির দাম গত বুধবার ২ শতাংশ কমে প্রতি ট্রয় আউন্স ৪ হাজার ৭৫ ডলারে নেমে আসে। এরপর গত বৃহস্পতিবার দাম বাড়ে ১ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ফেড) সুদহার বাড়াতে পারে, এমন ধারণায় গত সপ্তাহে স্বর্ণের দাম কিছুটা কমেছিল। তবে সপ্তাহান্তে ডলারের দরপতন ও মূল্যস্ফীতির নতুন শঙ্কার কারণে মূল্যবান ধাতুটির দাম আবারো বেড়ে যায়।

অনেকের মতে, দাম বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কিছুটা কমলেও পতন দীর্ঘস্থায়ী হবে না, বরং ১২-২৪ মাসের মধ্যে নতুন উচ্চতায় পৌঁছবে স্বর্ণ।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের (ডব্লিউজিসি) প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, গত মাসে প্রায় ৬৩ টন স্বর্ণ কিনেছে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০২৪ সালের নভেম্বরের পর কোনো একক মাসে এটিই সর্বোচ্চ স্বর্ণ কেনার হিসাব। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যের ভিত্তিতে এ হিসাব তৈরি করেছে সংস্থাটি।

এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রতি ট্রয় আউন্স ৫ হাজার ৫০০ ডলারের ওপরে উঠে রেকর্ড গড়ে স্বর্ণের দাম। এরপর অনেকটা কমলেও এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে ধাতুটির মূল্য।

লন্ডনে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস আয়োজিত মূল্যবান ধাতুবিষয়ক সম্মেলনে গত বুধবার স্বর্ণের ভবিষ্যৎ দাম নিয়ে পূর্বাভাস দেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা। ট্রয় অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের তহবিল ব্যবস্থাপক শার্লট ইয়ং বলেন, ‘‌১২-১৮ মাসের মধ্যে স্বর্ণের দাম নতুন রেকর্ড গড়তে পারে।’

ইয়ংয়ের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারি অর্থ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ায় স্বর্ণের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ দ্রুত বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি অন্যতম। অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সাধারণত নতুন করে মুদ্রা ছাপায়, যা মুদ্রার বিনিময় হার ও কেনাকাটার সক্ষমতা কমিয়ে দেয়। কিন্তু ইচ্ছে করলেই স্বর্ণের জোগান বা পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব নয়। ফলে মূল্যস্ফীতি ও অর্থের মান কমে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে নিজের সম্পদ রক্ষা করতে সবাই স্বর্ণকে নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে বেছে নেয়।

আয়ন ইনভেস্টমেন্টসের ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা পল কার্নও দুই বছরের মধ্যে স্বর্ণের দাম নতুন রেকর্ড গড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন। তার মতে, ডলারকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলে বিভিন্ন দেশ ও বিনিয়োগকারী বিকল্প সম্পদের দিকে ঝুঁকতে পারেন। সে ক্ষেত্রে স্বর্ণ হয়ে উঠতে পারে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প।

এন্ডেভার মাইনিংয়ের প্রধান নির্বাহী ইয়ান ককারিল বলেন, ‘বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা, সাধারণ কাগজের মুদ্রার ওপর মানুষ ও ব্যাংকের আস্থা কমে যাওয়া এবং নিজেদের দেশীয় মুদ্রার মান ধরে রাখা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর উদ্বেগের কারণেই মূলত স্বর্ণের দাম দিন দিন বাড়ছে।’

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের পণ্যবাজার গবেষণা বিভাগের বৈশ্বিক প্রধান সুকি কুপার বলেন, ‘‌কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে স্বর্ণের চাহিদা এখনো শক্তিশালী। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর কিছু দেশ অর্থের জোগান বাড়াতে স্বর্ণ বিক্রিও করেছে।’

ইয়ংয়ের মতে, উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ডলারের বিকল্প রিজার্ভ মুদ্রা খুঁজছে। এক্ষেত্রে ইউরো বা জাপানি ইয়েনের পরিবর্তে স্বর্ণের প্রতি আগ্রহ বেশি দেখা গেছে।

আরও