হরমুজ প্রণালির অস্থিরতায় ফের বাড়ছে নৌ-বীমার প্রিমিয়াম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বেড়েছে।

ফলে হরমুজ প্রণালিতে নৌ-পরিবহন ফের বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এর জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধকালীন নৌ-বীমার প্রিমিয়াম বা মাশুল আবারো আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। গত এক সপ্তাহে দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে গুরুত্বপূর্ণ জলপথটিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। খবর দ্য ন্যাশনাল।

বীমা ব্রোকার ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান মার্শের মেরিন, কার্গো ও লজিস্টিকস বিভাগের বৈশ্বিক প্রধান মার্কাস বেকার জানান, ওই অঞ্চলে যুদ্ধকালীন বীমার হার এখন জ্বালানি তেলের দামের মতো ওঠানামা করছে। কিছুদিন আগে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের পর বীমার হার কিছুটা কমেছিল। তবে গত কয়েক দিনের সংঘাতের পর তা আবার দ্রুতগতিতে বাড়ছে।

বর্তমানে জাহাজের মূল কাঠামোগত মূল্যের ওপর ৩-১০ শতাংশ পর্যন্ত যুদ্ধকালীন বীমা মাশুল ধরা হচ্ছে। এ হিসাব অনুযায়ী, ১০ কোটি ডলার মূল্যের একটি তেলবাহী ট্যাংকারের জন্য এখন বীমা প্রিমিয়াম দিতে হচ্ছে ৩০ লাখ থেকে ১ কোটি ডলার। অথচ বৈশ্বিক উত্তেজনা শুরুর আগে বীমার হার ছিল দশমিক ২৫ শতাংশ। সে সময়ে একই জাহাজের জন্য প্রিমিয়াম লাগত আড়াই লাখ ডলার।

জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গুয়েজ চলতি মাসের শুরুতে বীমার অতিরিক্ত খরচ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, ‘বীমার উচ্চ ব্যয় জাহাজ মালিক ও পরিচালনাকারীদের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও বীমা কোম্পানিগুলো দাম কমাচ্ছে না। বীমা প্রিমিয়ামের বাড়তি খরচের কারণে শেষ পর্যন্ত পণ্যের পরিবহন খরচ বাড়ছে, যা সরাসরি সাধারণ ভোক্তাদের ওপর প্রভাব ফেলছে।’

তবে গ্লোবাল বডি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব মেরিন ইন্স্যুরেন্স (আইইউএমআই) এ অভিযোগের সমালোচনা করেছে। সংস্থাটি এক বিবৃতিতে জানায়, বীমা খাত কোনো সমস্যা নয়, বরং সংকটের মধ্যেও সেবা দিয়ে যাচ্ছে। হরমুজ প্রণালিতে যেভাবে নিয়মিত হামলা চলছে, বীমার দাম মূলত সে ঝুঁকির আলোকেই নির্ধারিত হচ্ছে। এটি একটি আন্তর্জাতিক ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার, তাই এখানে সরকারি হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ নেই বলে জানায় সংস্থাটি।

ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব বাণিজ্য রুটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি স্থবির হয়ে পড়ে। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গত ১৭ জুন একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। কিন্তু ফের পাল্টাপাল্টি হামলার পর গত শনিবার রাতে ইরান গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি আবারো বন্ধ ঘোষণা করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, হরমুজ প্রণালিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুটি সুপারট্যাংকারে গত মঙ্গলবার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় তেহরান। ‘মম্বাসা’ ও ‘আল বাহয়াহ’ নামের ট্যাংকার দুটি পরিচালনা করত এডনক লজিস্টিকস অ্যান্ড সার্ভিসেস। ইরানি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের এ হামলায় একজন নাবিক নিহত ও আটজন আহত হন। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীও পাঁচদিন ধরে ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। ফলে জলপথটি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

আইএমওর সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, সংঘাতপূর্ণ এ অঞ্চলে বর্তমানে প্রায় ছয় হাজার নাবিক আটকা পড়ে আছেন। তাদের নিরাপদ রুট দিয়ে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা চলছে।

মার্শের কর্মকর্তা মার্কাস বেকার বলেন, ‘এখন সবচেয়ে বড় সংকট হলো নাবিক ও সম্পদের নিরাপত্তা। দুই পক্ষ যেভাবে অননুমেয় আচরণ করছে, তাতে জাহাজ মালিকরা গভীর উদ্বেগের মধ্যে আছেন।’

তিনি জানান, বর্তমানে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার জন্য জাহাজগুলোকে দুটি ভিন্ন পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। একটি উত্তর দিকের ইরানি পথ ও অন্যটি দক্ষিণ দিকের ওমানি পথ। উত্তর দিকের পথটি ব্যবহার করলে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের আইনি ঝুঁকি থাকে। দক্ষিণ দিকের পথটি ব্যবহার করলে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) সরাসরি হামলার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। ফলে কোন পথ দিয়ে জাহাজ যাবে, তার ওপর ভিত্তি করে বীমার খরচ ও শর্ত পরিবর্তন হচ্ছে।

আরও