জীবন, জলবায়ু, খাদ্য ও বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে এর সম্পর্ক গভীর। কিন্তু স্থলভাগে মানুষের সংঘাত, যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রভাব এখন ক্রমেই সমুদ্রের গভীরে পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ।
আজ বিশ্ব মহাসাগর দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সমুদ্রের এ নীরব সংকটের চিত্র উঠে এসেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপর এর প্রভাব সমুদ্রের পরিবেশকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি ইরান গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে বিদেশী জাহাজ চলাচল সীমিত করে। ফলে বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হয়। পারস্য উপসাগরে আটকা পড়েন প্রায় ২০ হাজার নাবিক। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে জাতিসংঘ মহাসচিব যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানান।
তবে পানির নিচের জগৎ ভিন্ন এক বাস্তবতার সাক্ষী। ওপরে রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সামরিক মানব সৃষ্ট সংঘাত চললেও মাছ, ডলফিন ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন চালিয়ে যায়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসকারী তিনজন চীনা ডুবুরি রুই লি, শানশান দু ও জিয়ে ঝাং এ বাস্তবতা কাছ থেকে দেখেছেন। উপকূলীয় এলাকায় প্রবেশ নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা কয়েক সপ্তাহ সমুদ্রে নামতে পারেননি। পরে সীমিত যুদ্ধবিরতির সুযোগে ফের পানিতে নামার সুযোগ পান তারা।
শানশান দু জানান, দীর্ঘ বিরতির পর সমুদ্রে নামার আগে তাদের কিছুটা উদ্বেগ ছিল। কিন্তু পানির নিচে নেমে তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। সেখানে যুদ্ধের কোনো চিহ্ন চোখে পড়েনি। বরং বিশাল ডলফিনের ঝাঁক ও শান্ত পরিবেশ তাদের মুগ্ধ করেছে। তার ভাষায়, সমুদ্রের নিচে ছিল শুধু ‘শান্তি ও সুন্দর’।
তবে সৌন্দর্যের মধ্যেও উদ্বেগের কারণ খুঁজে পেয়েছেন ডুবুরিরা। জিয়ে ঝাং জানান, সমুদ্রতলের বিভিন্ন স্থানে আগের তুলনায় বেশি সাদা রঙের বর্জ্য দেখা গেছে। এসব বর্জ্যের উৎস সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত নন। এছাড়া ডলফিনের আশপাশের পানিতে সবুজ শৈবাল, তেলের আস্তরণ ও ভাসমান আবর্জনাও লক্ষ করেছেন।
তিনি বলেন, ‘আগে ডলফিনের পেছনে গেলে দেখা যেত চারপাশের পানি স্বচ্ছ নীল। এখন সেখানে দূষণের চিহ্ন স্পষ্ট। নিজের চোখে এমন দৃশ্য দেখা অত্যন্ত কষ্টদায়ক।’
বর্তমান বিশ্বে ‘ব্লু ইকোনমি’ বা সমুদ্রনির্ভর অর্থনীতি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ ও বৈশ্বিক বাণিজ্যিক কার্যক্রমের ফলে সমুদ্র দূষণের ঝুঁকি বাড়ছে। তেলবাহী জাহাজ, সামরিক নৌযান, শিল্পবর্জ্য ও সামুদ্রিক পরিবহন ব্যবস্থার চাপ সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রকে ক্রমেই দুর্বল করে তুলছে।
রুই লি জানান, সংশ্লিষ্ট প্রণালিটির ভূপ্রাকৃতিক বৈচিত্র্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে নানা ধরনের প্রবাল, সামুদ্রিক ঘোড়া, তিমি হাঙর ও বিরল কিছু প্রাণীর বসবাস রয়েছে। কিছু প্রবাল রুপালি সাদা, আবার কিছু বেগুনি রঙের, যা এক অনন্য পরিবেশ তৈরি করেছে।
তার মতে, এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা সামরিক হামলা পুরো বাস্তুতন্ত্রকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে।
বিশেষ করে তেল সংরক্ষণাগার বা জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে। কারণ তেল ছড়িয়ে পড়লে অসংখ্য ছোট সামুদ্রিক প্রাণী দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনকি মানুষের অজানা অনেক বিরল প্রজাতিও বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।
জিয়ে ঝাং মনে করেন, সমুদ্রের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এটি নিজের হয়ে কথা বলতে পারে না। মাছ কিংবা অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী তাদের ক্ষতির কথা মানুষের কাছে তুলে ধরতে পারে না।
তার ভাষায়, মানুষ স্থলভাগের যুদ্ধ, বিরোধ ও দূষণের প্রভাব সমুদ্রের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। অথচ সমুদ্রের আত্মরক্ষার সক্ষমতা সীমিত।
গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটে সংঘাত দেখা দিলে অর্থনীতি ও পরিবেশ উভয়ই ঝুঁকির মুখে পড়ে। যুদ্ধকালীন নৌচলাচল, তেল ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ও বর্জ্য বাড়ার কারণে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ বাড়ে।
রুই লি সমুদ্রকে মানুষের অভিভাবকের সঙ্গে তুলনা করেন। তার মতে, সমুদ্র মানুষকে খাদ্য, অক্সিজেন ও জীবিকা দেয়। কখনো কখনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাধ্যমে সতর্কও করে। কিন্তু তার পরও মানুষের জীবনধারণে এর অবদান অপরিসীম।
বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ, অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ ও যুদ্ধসহ সব মিলিয়ে সমুদ্র আজ বহুমাত্রিক চাপে রয়েছে।
ফলে সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণ শুধু পরিবেশগত ইস্যু নয়, এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি ও মানবসভ্যতার ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িত।
বিশ্ব মহাসাগর দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য হলো ‘মানুষ ও মহাসাগরের সম্পর্ক নতুনভাবে কল্পনা করা’। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার সময় এখনই। কারণ সমুদ্রের ক্ষতি শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবন ও অর্থনীতিকেই প্রভাবিত করবে।
প্রতিবেদন বলছে, সমুদ্রের নিচের জগৎ আজও বিস্ময়কর সৌন্দর্যে ভরপুর। কিন্তু সে সৌন্দর্যের আড়ালে জমছে দূষণ, সংঘাত ও পরিবেশগত ঝুঁকি। তাই সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও সংঘাত কমানোর উদ্যোগকে আরো জোরদার করার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।