সম্প্রতি জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে কিছুটা স্থিতিশীলতার পাশাপাশি নির্মাণ মৌসুম শুরুর কারণে এ খাতে কাঁচামালের চাহিদা বেড়ে যায়। তবে এ সময়ে এসে মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট সংঘাত খাতটিকে ফের অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। এরই মধ্যে প্রায় প্রতিদিনই রড-সিমেন্টসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়ছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে দেশের নির্মাণ খাত স্থবির হয়ে যাওয়ার শঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
বাংলাদেশে নির্মাণসামগ্রীর কাঁচামালের সিংহভাগই আমদানিনির্ভর। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের মধ্যে একাধিক সংকটে পড়েছে এ খাতের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটে বেড়ে গেছে পরিবহন খরচ। আবার হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইউরোপের কিছু কিছু দেশ থেকে পণ্য আমদানিতে বিকল্প পথ ব্যবহার করছে শিপিং কোম্পানিগুলো। যার কারণে আগে দেশে কাঁচামাল আসতে ৪৫ দিন লাগলেও এখন সময় লাগবে অন্তত ৬০ দিন বা দুই মাস।
জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় শিপিং চার্জ ও ইন্স্যুরেন্সের প্রিমিয়াম বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি ফিউচার মার্কেটে অপরিশোধিত কাঁচামালের বুকিং দর বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের বাজারে নির্মাণসামগ্রীর দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা।
জানা যায়, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান আক্রমণ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ফলে দেশটিও পাল্টা আক্রমণ শুরু করে, এক পর্যায়ে এ যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। এর কয়েক দিনের ব্যবধানে যুদ্ধ ও বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অবরোধের ঢাল হিসেবে কৌশলগত হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানিবাহী নৌযান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেয় ইরান। তবে ধারাবাহিক সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে চীন ও রাশিয়ার মতো কৌশলগত মিত্র দেশের জাহাজ চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা রাখেনি দেশটি। তবে এদিকে ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জ্বালানি পরিশোধনাগারে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরিপ্রেক্ষিতে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারে পৌঁছে গেছে, যা বিশ্বব্যাপী পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাকে সংকটে ফেলছে।
দেশীয় উদ্যোক্তারা বলছেন, গত কয়েক বছর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতায় নির্মাণ খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল খুবই শ্লথ। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও এ খাতে তেমন একটা পরিবর্তন হয়নি। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি নির্মাণ মৌসুম শুরু হওয়ায় নির্মাণ খাতে অনেকটা গতি ফিরেছে। এর ফলে দেশের রড-সিমেন্ট কোম্পানিগুলোর উৎপাদন আগের বছরের চেয়ে ৩০-৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ এ খাতের কাঁচামালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে দাবি করছেন উদ্যোক্তারা।
দেশে ইস্পাতপণ্য উৎপাদনকারী বিভিন্ন কোম্পানির দেয়া তথ্যানুসারে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর আগে দেশে প্রতি টন প্রথম গ্রেডের রডের দাম ছিল ৭৭-৮৩ হাজার টাকার মধ্যে। যুদ্ধ শুরুর পরপরই তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮০-৮২ হাজার টাকায়। গত এক সপ্তাহে প্রতিদিনই টনপ্রতি ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে রডের দাম। সবশেষ গতকাল টনপ্রতি সর্বোচ্চ ৯৫-৯৭ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হলে রডের দাম আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।
জানতে চাইলে এশিয়ান পেইন্টস চট্টগ্রামের রিজিওনাল হেড রানা রক্ষিত বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পেইন্টস নির্মাণ খাতের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেশের নির্মাণ খাতে রঙের চাহিদা বেড়েছে। দেশের প্রায় সব শীর্ষ কোম্পানির এক-দেড় মাসের স্টক থাকে। ফলে যুদ্ধ শুরুর দুই সপ্তাহের মধ্যে মজুদ ফুরিয়ে না যাওয়ায় দাম বাড়েনি।’ তবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত অব্যাহত থাকলে অন্যান্য নির্মাণপণ্যের মতো রঙের দামও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
দেশের বিভিন্ন সিমেন্ট কোম্পানি ও ডিলারদের তথ্যানুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর ১ মার্চ প্রতি ব্যাগ (৫০ কেজি) সিমেন্টের দাম ছিল ৪৫০-৪৮০ টাকা। সবশেষ গতকাল তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭০-৫০০ টাকায়।
জানা যায়, কনফিডেন্স সিমেন্ট লিমিটেড ৪ মার্চ থেকে প্রতি ব্যাগ সিমেন্টের দাম ৫ টাকা বৃদ্ধি করে। এর কয়েকদিন পর আরো ৫ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দেয় প্রতিষ্ঠানটি, যা বৃহস্পতিবার থেকে কার্যকর হয়েছে। একইভাবে ফ্রেশ সিমেন্ট কোম্পানি প্রতি ব্যাগ সিমেন্টের দাম ১০ টাকা বৃদ্ধি ছাড়াও বিক্রয়ের ওপর বিশেষ প্রণোদনা (কমিশন) উঠিয়ে নিয়েছে। এছাড়া এনজিএস সিমেন্ট ৫ টাকা, রুবি সিমেন্ট ১০ টাকা ও ডায়মন্ড সিমেন্ট ১০ টাকা হারে প্রতি ব্যাগ সিমেন্টের দাম বাড়িয়ে বাজারজাত করছে। যুদ্ধ চলমান থাকলে চলতি সপ্তাহে দাম আরো বাড়বে বলে কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে ডিলার প্রতিষ্ঠানগুলোকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে।
যোগাযোগ করা হলে কনফিডেন্স সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির উদ্দিন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এমনিতে যুদ্ধের কারণে শিপিং চার্জ বেড়ে গেছে। ফলে উৎপাদিত সিমেন্টের খরচও বাড়তি। আবার আমদানি হওয়া কাঁচামাল বন্দরে পৌঁছালেও জ্বালানি সরবরাহ ইস্যুতে কারখানায় পৌঁছাতে বিলম্ব হচ্ছে। এতে চাহিদা থাকলেও পর্যাপ্ত সিমেন্ট উৎপাদন করতে পারছে না অনেক প্রতিষ্ঠান।’ এসব কারণে খুচরা বাজার থেকে শুরু করে সব জায়গায় সিমেন্টের চাহিদা ও দাম দুটোই ঊর্ধ্বমুখী বলে দাবি করেছেন তিনি।
জানা যায়, নির্মাণ মৌসুমের শুরুতে দেশের শীর্ষস্থানীয় ইস্পাতপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম, একেএস, কেএসআরএম, জিপিএইচসহ বিভিন্ন কোম্পানি রডের উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়। গত ডিসেম্বরের তুলনায় এ সময়ে উৎপাদন ৩৫-৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে যথাসময়ে কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্ব, কাঁচামালের দর বৃদ্ধি ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে উৎপাদনে। অন্যদিকে এরই মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে অবস্থানরত বিভিন্ন জাহাজ থেকে লাইটারেজ জাহাজে করে কাঁচামাল সরবরাহের ক্ষেত্রেও বিলম্ব হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ইস্পাত কোম্পানিগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, দেশে জ্বালানি তেল রেশনিংয়ের কারণে লাইটারেজ জাহাজ পরিচালনায় সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক জাহাজে ফুয়েল না থাকায় যথাসময়ে পণ্য লোডিং করে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি। এ কারণে উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটে পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রভাব পড়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে কোম্পানির তুলনায় সারা দেশের খুচরা ও পাইকারি পর্যায়ে রডের দর বৃদ্ধির হার অনেক বেশি বলেও দাবি করেন তারা।
এ প্রসঙ্গে রড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কেএসআরএম গ্রুপের পরিচালক (বিক্রয় ও বিপণন) মো. জসিম উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কাঁচামালের সরবরাহ সংকটে রডের দাম প্রতিদিনই বাড়ছে। যুদ্ধের কারণে আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। আবার দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকায় রডের চাহিদাও বেড়েছে।’ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে রডের বাজার আরো বাড়তে পারে বলে শঙ্কা করছেন তিনি।
নির্মাণ খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে প্রায় দুই বছর ধরে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় রড-সিমেন্টের বাজার নাজুক অবস্থায় ছিল। এখন নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে আসায় ও নির্মাণ মৌসুমের কারণে চাহিদা অনেক বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে আবারো ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনায় থাকলেও হঠাৎ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে শুরু হওয়া সংঘাত নির্মাণ খাতে বড় প্রভাব ফেলেছে। যুদ্ধ আরো দীর্ঘায়িত হলে দেশে নির্মাণ খাতের কাঁচামালের বাজারে রেকর্ড পরিমাণ মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন তারা।