নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা

টেকসই ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ার কারিগর হতে চাইলে...

নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা এমন একটি বিজ্ঞান এবং শিল্প, যা শহর ও গ্রামীণ অঞ্চলের ভূমি, অবকাঠামো, পরিবেশ, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনযাত্রাকে সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও টেকসইভাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবেলা এবং নাগরিকের জীবনমান উন্নয়নের অন্যতম যুগোপযোগী সমাধান সুষ্ঠু নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা। এর মাধ্যমে শহর ও অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নত করে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায়; একই সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন জীবনমান, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা এবং টেকসই উন্নয়নও নিশ্চিত করা সম্ভব। অত্যধিক জনসংখ্যা, অবকাঠামোগত সমস্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সুষ্ঠু পরিকল্পনা এখন বাংলাদেশের জন্য অবধারিত গন্তব্য। এ লক্ষ্যেই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় দেশে সর্বপ্রথম নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা (ইউআরপি) ডিসিপ্লিন চালু করে।

নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা এমন একটি বিজ্ঞান এবং শিল্প, যা শহর ও গ্রামীণ অঞ্চলের ভূমি, অবকাঠামো, পরিবেশ, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনযাত্রাকে সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও টেকসইভাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। এটি শুধু প্রয়োগিক বিষয় নয়, মানুষের চিন্তাচেতনা ও সামাজিক পরিবর্তনেও ভূমিকা রাখে। আগামী ৩০ বা ৫০ বছরে একটি শহর বা অঞ্চল কেমন হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করে পরিকল্পনাবিদের দূরদর্শিতার ওপর।

বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ, নদীমাতৃক ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশে এর গুরুত্ব অপরিসীম। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা, যানজট, আবাসন সংকট, দুর্যোগ ঝুঁকি, খরা, ভূমির অপব্যবহার, লবণাক্ততা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এখন নিত্যসঙ্গী। প্রশিক্ষিত পরিকল্পনাবিদ ও সুষ্ঠু পরিকল্পনাই এসব সমস্যার টেকসই সমাধান দিতে পারে।

ইউআরপি ডিসিপ্লিন আধুনিক ও বৈশ্বিক মানের সিলেবাসে পাঠদান করে, যেখানে তাত্ত্বিক জ্ঞানের সঙ্গে বাস্তব প্রয়োগের সমন্বয় ঘটানো হয়। পরিকল্পনার মৌলিক ধারণার পাশাপাশি প্রযুক্তি ও ডেটা সায়েন্স শিক্ষায় এটি বাংলাদেশে অনন্য। শিক্ষার্থীরা জিআইএস, রিমোট সেন্সিং, স্পেসিয়াল মডেলিং ও প্রোগ্রামিংয়ের পাশাপাশি ট্রান্সপোর্টেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, আরবান ডিজাইন, ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইন ও কনস্ট্রাকশন ম্যানেজমেন্ট পড়েন। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার লক্ষ্যে পাঠ্যক্রমে যুক্ত হয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা এবং শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত জনপদ পরিকল্পনার মতো বিষয়। স্টুডিওভিত্তিক প্রজেক্ট, মাঠ পর্যায়ের জরিপ ও গবেষণার মাধ্যমে হাতেকলমে শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়।

ডিসিপ্লিনে রয়েছে স্মার্ট সিটি ইনোভেশন ল্যাব, জিআইএস ল্যাব, রিমোট সেন্সিং ল্যাব ও ফটোগ্রামেট্রি ল্যাব, যেখানে শিক্ষার্থীরা এআরসিজিআইএস, ইআরডিএএস ইমাজিন ও মেটাশেইপের মতো সফটওয়্যার ব্যবহারের সুযোগ পান। সার্ভেয়িং ও কার্টোগ্রাফি ল্যাবে তারা আরটিকে জিপিএস, টোটাল স্টেশন ও ড্রোন ইমেজের মতো যন্ত্র পরিচালনা শেখেন।

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা নিয়মিত দেশী-বিদেশী গবেষণায় যুক্ত থাকেন। শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, স্থানীয় সরকার ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সংস্থার গবেষণা প্রকল্পে তাদের সম্পৃক্ততা উল্লেখযোগ্য। স্নাতক পর্যায়ে প্রত্যেক শিক্ষার্থী থিসিস কোর্সের আওতায় একক গবেষণা সম্পন্ন করেন। অনেকে দেশ-বিদেশের প্রতিযোগিতা ও স্বেচ্ছাসেবী কাজে অংশ নিয়ে সুনাম অর্জন করেন। ক্যারিয়ার টক, হোমকামিং লেকচার ও টেকনিক্যাল দক্ষতাবিষয়ক সেমিনারও নিয়মিত আয়োজন করা হয়।

শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা অনুদানে অংশ নিতে এবং শিক্ষকদের সঙ্গে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রকল্পে কাজ করতে পারেন। এতে বাস্তব গবেষণার অভিজ্ঞতা, পেশাদার নেটওয়ার্ক ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ গড়ে ওঠে। যৌথ গবেষণার মাধ্যমে দেশী-বিদেশী জার্নাল ও সম্মেলনে গবেষণাপত্র প্রকাশের সুযোগও রয়েছে, যা উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ইউআরপি মাল্টিডিসিপ্লিনারি বিষয় হওয়ায় গ্র্যাজুয়েটদের কর্মক্ষেত্র বহুমুখী। রাজউক, কেডিএ, সিডিএ, আরডিএ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর ও এলজিইডির মতো উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে তাদের কাজের সুযোগ রয়েছে। এছাড়া বেপজা, অন্যান্য অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটির মতো বিশেষায়িত সংস্থায়ও পরিকল্পনাবিদেরা কাজ করেন। বিগত কয়েক বছরে গ্র্যাজুয়েটদের একটি বড় অংশ বিসিএস (প্রশাসন, পরিকল্পনা, পুলিশ) এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের নন-ক্যাডার পদে কর্মরত।

ব্যাংক ও আর্থিক খাতেও পরিকল্পনাবিদদের বিচরণ রয়েছে। প্রবেশনারি ও সিনিয়র অফিসারের মতো পদের পাশাপাশি প্রকল্প মূল্যায়ন, ঋণ ও বিনিয়োগ বিশ্লেষণ এবং রিয়েল এস্টেট ও সম্পদ মূল্যায়নের কাজে তারা যুক্ত হতে পারেন।

দেশী-বিদেশী এনজিও ও আন্তর্জাতিক সংস্থা পরিকল্পনাবিদদের অন্যতম বড় কর্মক্ষেত্র। ইউএনডিপি, ইউএন-হ্যাবিটাট, ইউএনএইচসিআর, আইওএম, ইউএসএআইডি, জিআইজেড, জাইকা, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, এডিবি, সেভ দ্য চিলড্রেন, ওয়াটারএইড ও কেয়ারের মতো সংস্থায় গ্র্যাজুয়েটরা কাজ করছেন। দেশীয় সংস্থার মধ্যে ব্র্যাক, ফ্রেন্ডশিপ, জেজেএস ও উত্তরণেও রয়েছে সুযোগ।

প্রযুক্তি খাতেও রয়েছে অনন্য ক্যারিয়ার পথ। জিআইএস অ্যানালিস্ট, আরবান ডেটা সায়েন্টিস্ট ও জিওস্পেশিয়াল প্রোগ্রামারের মতো পেশায় গ্র্যাজুয়েটদের চাহিদা বাড়ছে। ডিসিপ্লিনটি উদ্যোক্তাও তৈরি করেছে; পরিকল্পনা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কিংবা জিআইএস ও রিমোট সেন্সিং সেবাদানকারী সংস্থা গড়ার সুযোগ রয়েছে। শিক্ষকতা ও মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নে পরামর্শক হিসেবেও ক্যারিয়ার গড়া যায়। ডিসিপ্লিনের অনেক গ্র্যাজুয়েট বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, সুইডেন, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস ও নিউজিল্যান্ডসহ বহু দেশে অধ্যয়ন এবং কর্মরত। জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও সুইডেনে পরিকল্পনা, জিওইনফরমেশন ও জলবায়ু বিষয়ে মাস্টার্স এবং পিএইচডির সুযোগ রয়েছে। ইরাসমাস+, কমনওয়েলথসহ বিভিন্ন স্কলারশিপে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত এসব দেশে যাচ্ছেন। প্রতি বছর একটি বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়েও স্কলারশিপ নিয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য যায়।

নগর পরিকল্পনা এমন একটি পেশা, যার প্রভাব মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং সুষম আঞ্চলিক উন্নয়নের মাধ্যমে শহর ও গ্রামকে আরো বাসযোগ্য, নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জলবায়ুসহনশীল করা যায়। জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ ঝুঁকি, আবাসন সংকট, পরিবহন সমস্যা, সামাজিক বৈষম্য ও নগর সেবার অসম বণ্টনের মতো সমস্যা সমাধানে পরিকল্পনাবিদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটি একটি পেশাদারি শিক্ষা। শুরু থেকেই স্টুডিও, ফিল্ডওয়ার্ক, প্রজেক্ট ও ল্যাবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বাস্তব সমস্যা সমাধানের জন্য প্রস্তুত করা হয়।

বাংলাদেশের শহর ও গ্রামকে বাসযোগ্য, সহনশীল ও টেকসই করার দায়িত্ব আগামী প্রজন্মের পরিকল্পনাবিদদের। যারা মানচিত্রে নতুন ভবিষ্যৎ আঁকতে এবং প্রযুক্তি ও মানবিকতার সমন্বয়ে সমাজের জন্য কাজ করতে চান, নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনাই হতে পারে তাদের সঠিক পছন্দ।

লেখক: বিভাগীয় প্রধান, নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা ডিসিপ্লিন

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও