কেমোথেরাপির ধকল ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার যন্ত্রণা এড়িয়ে কেবল ক্যান্সার কোষ ধ্বংসের নতুন আশা জাগাচ্ছেন বায়োপ্রকৌশলী ড. রহমান। বায়োইঞ্জিনিয়ারিং, ন্যানোমেডিসিন ও ইমিউনোথেরাপির মেলবন্ধনে তার তৈরি লিপিড-পলিমারভিত্তিক ন্যানো-প্লাটফর্ম শরীরে ‘স্মার্ট গাইডেড মিসাইলের’ মতো কাজ করে। যা সুস্থ কোষকে স্পর্শ না করেই নিখুঁতভাবে ক্যান্সার কোষে ওষুধ পৌঁছে দিতে সক্ষম। এ গবেষণা নিয়ে কাজ করছেন বাংলাদেশের তরুণ বিজ্ঞানী ড. মফিজুর রহমান। তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি ডিসিপ্লিন থেকে উচ্চ শিক্ষা শেষ করেছেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘মাউন্ট সাইনাইয়ের আইকান স্কুল অব মেডিসিনের’ ইমিউনোলজি অ্যান্ড ইমিউনোথেরাপি বিভাগে পোস্টডক্টরাল ফেলো হিসেবে গবেষণারত। ন্যানোটেকনোলজি, বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং ও মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে তিনি আবিষ্কার করেছেন ক্যান্সার প্রতিরোধের যুগান্তকারী গবেষণা।
গবেষণায় ড. রহমান ও তার সহকর্মীরা ‘সার্চ-কভ-২ এমআরএনএ’ ব্যবহার করে ক্যান্সার ইমিউনোথেরাপির একটি অভিনব কৌশল আবিষ্কার করেছেন। এ পদ্ধতিতে ক্যান্সার কোষে করোনাভাইরাসের ‘স্পাইক প্রোটিন’ তৈরি করার বার্তা পৌঁছে দিতে বিশেষভাবে তৈরি একটি ন্যানোমেডিসিন ব্যবহার করা হয়। ক্যান্সার কোষগুলো যখন স্পাইক প্রোটিন তৈরি করতে শুরু করে, তখন শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা (ইমিউন সিস্টেম) করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে আগে তৈরি হওয়া প্রতিরোধ স্মৃতির (ইমিউন মেমোরি) মাধ্যমে টিউমারটিকে শনাক্ত করতে পারে। ফলে ভাইরাসের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া মানবদেহের স্বাভাবিক ইমিউনিটিকে ক্যান্সার কোষ শনাক্ত ও ধ্বংস করার কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হয়।
স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত ইঁদুরের ওপর গবেষণায় দেখা গেছে, এ ন্যানোমেডিসিন শক্তিশালী অ্যান্টি-টিউমার ইমিউন রেসপন্স তৈরি করে এবং টিউমারের বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। এর পাশাপাশি এ ন্যানোমেডিসিন সরাসরি টিউমারের ভেতরে জমে থাকার ক্ষমতা দেখিয়েছে, যা সুস্থ টিস্যুকে অক্ষত রেখে ক্যান্সার ইমিউনোথেরাপিকে আরো নিখুঁত করার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেয়।
গবেষক ড. মফিজুর রহমান বলেন, ‘আমরা যখন করোনা আক্রান্ত হয়েছিলাম বা টিকা নিয়েছিলাম, তখন আমাদের শরীর ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনকে চিনে রেখেছিল, যাকে বলা হয় ইমিউন মেমোরি। ন্যানোমেডিসিনের সাহায্যে স্তন ক্যান্সার কোষে করোনার সেই স্পাইক প্রোটিন তৈরির জিনগত বার্তা (এমআরএনএ) পৌঁছে দেয়। বার্তা পেয়ে ক্যান্সার কোষগুলো নিজেদের শরীরে করোনার স্পাইক প্রোটিন তৈরি করতে শুরু করে। আর তা দেখেই আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেবে নেয় যে সেখানে ভাইরাস রয়েছে। ফলে আগের চেনা মেমোরি থেকে ইমিউন সিস্টেম ক্ষিপ্ত হয়ে সেই ক্যান্সার কোষগুলোকে আক্রমণ করে গুঁড়িয়ে দেয়।’
স্তন ক্যান্সারের ওষুধ তৈরিতে ড. রহমানের আরেক বড় অর্জন হলো ‘ন্যানোবডি-ফাংশনালাইজড লিপোজোম’। ন্যানোবডি হলো অ্যান্টিবডির খুব ছোট এক রূপ, যা ক্যান্সার কোষের গায়ের প্রোটিনকে আলাদাভাবে চিনে নিতে পারে। আগে এ ন্যানোবডি দিয়ে ওষুধ তৈরি করতে অনেক জটিল ও দীর্ঘ পথ পেরোতে হতো। গবেষক ও তার দল মাত্র এক ধাপেই এটি তৈরির অত্যন্ত সহজ একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। এ ন্যানোমেডিসিন শরীরের অন্য কোথাও না গিয়ে সোজা স্তন ক্যান্সার টিউমারে গিয়ে জমে এবং চিকিৎসা চালায়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের পেটেন্ট (স্বত্ব) নেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। ভবিষ্যতে এটি বড় পরিসরে বাণিজ্যিক ওষুধ হিসেবে তৈরি করা সহজ হবে।
ড. রহমানের গবেষণার আরেকটি উল্লেখযোগ্য অংশ হলো ‘ইঞ্জিনিয়ার্ড এক্সট্রাসেলুলার ভেসিকল’ ও ‘এক্সোজোম’। এক্সোজোম হলো প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া অতি ক্ষুদ্র ন্যানোস্কেল ভেসিকল, যা কোষকে জৈবিক অণু পরিবহন করতে এবং অন্য কোষের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান করতে সাহায্য করে।
এ প্রাকৃতিক থলিগুলোকে কাজে লাগিয়েছেন লিভার ক্যান্সার চিকিৎসায়। তিনি জিন প্রকৌশল ব্যবহার করে এক্সোজোমের ওপর এমন কিছু গাইড বসিয়ে দিয়েছেন, যা নিখুঁতভাবে লিভার ক্যান্সার কোষকে চিনে ফেলে। ফলে থলির ভেতরের ওষুধ সোজা লিভার টিউমারে গিয়ে আঘাত হানে।
ভবিষ্যতে ড. রহমান এমন একটি স্বাধীন গবেষণাগার গড়ে তুলতে চান, যা ন্যানোটেকনোলজি ও বায়োমেডিকেল সায়েন্সকে কাজে লাগিয়ে লিউকেমিয়াসহ বিভিন্ন কঠিন টিউমারের নতুন সব চিকিৎসা আবিষ্কার করবে।