ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি

সৌরশক্তিতে গড়ে উঠছে পরিবেশবান্ধব টেকসই ইনার সিটি ক্যাম্পাস

বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছেই। একই সঙ্গে বাড়ছে জ্বালানি নিয়ে অনিশ্চয়তাও।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ, রাজনৈতিক উত্তেজনা আর তেলের দামের ওঠানামা এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা। তাই অনেক দেশই এখন বিকল্প শক্তির উৎস খুঁজছে। কেউ ঝুঁকছে বাতাসের শক্তির দিকে, কেউ সমুদ্রের শক্তিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। বাংলাদেশের মতো রোদপ্রধান অঞ্চলে সৌরশক্তিই হয়ে উঠছে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। আর সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়েছে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি।

পরিবেশবান্ধব ইনার সিটি ক্যাম্পাস

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করলেই বোঝা যায় ইনার সিটি ক্যাম্পাস কেবলই ক্যাম্পাস নয়। কংক্রিটের শহরের মাঝেও চারদিকে সবুজের ছোঁয়া। খোলা জায়গা, সবুজ ঘাসের চাদরে ঢাকা ছাদ, জলাধার, বায়োটোপ আর অসংখ্য গাছপালা পুরো বিশ্ববিদ্যালয়টাকে অন্যরকম করে তুলেছে। যেন জ্ঞান আর প্রকৃতি এখানে একসঙ্গে জায়গা করে নিয়েছে। এ পুরো ক্যাম্পাসটি তৈরি করা হয়েছে পরিবেশ সংরক্ষণের চিন্তা থেকে। এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যাতে প্রাকৃতিক আলো ও বাতাস বেশি প্রবেশ করতে পারে। আছে হাইব্রিড কুলিং সিস্টেম। এতে এয়ার কন্ডিশনের ওপর নির্ভরতা কমে। ভবনের চারপাশজুড়ে রয়েছে সবুজ গাছপালা, যা ভেতরের তাপমাত্রা অনেকটা ঠাণ্ডা রাখে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, উন্মুক্ত স্পেস, অত্যাধুনিক ল্যাব, মাল্টিপারপাস হল, লেকচার থিয়েটার সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় না, বরং ভবিষ্যতের টেকসই নগর ক্যাম্পাসের একটি উদাহরণ।

সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ

এ ক্যাম্পাসের ছাদে চলছে একটি নীরব বিপ্লব। রুফটপে বসানো সারি সারি সোলার প্যানেল, যা সূর্যের আলোয় দিনের বেলা এক বিশেষ সৌন্দর্যের আবহ তৈরি করে। অনেকটা চুপিসারে অত্যাধুনিক এ প্যানেলগুলো দিনের আলো জমিয়ে রাখছে। সেই আলোই পরে বিদ্যুৎ হয়ে চালাচ্ছে ক্লাসরুম, লিফট, লাইট আর ক্যাম্পাসের নানা কার্যক্রম। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ আসছে সৌরবিদ্যুৎ থেকে। ছাদজুড়ে বসানো হয়েছে ৩ হাজার ২৫২টি সোলার প্যানেল। পুরো সিস্টেমের পিক ক্যাপাসিটি ১ দশমিক ৪ মেগাওয়াট। উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ সরাসরি ক্যাম্পাসে ব্যবহার হয়। অতিরিক্ত অংশ চলে যায় জাতীয় গ্রিডে।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, এটি এখন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অন্যতম বড় রুফটপ সোলার উদ্যোগ। গত এক বছরে এ সোলার প্যানেল দিয়ে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে তা ছিল ঢাকা শহরের পাঁচ হাজারের বেশি পরিবারের বার্ষিক বিদ্যুৎ চাহিদার সমান। এ সোলার প্যানেলগুলোর ফলে কার্বন নিঃসরণ কমেছে শত শত টন।

শুরুটা সহজ ছিল না

এ প্রকল্পের পেছনে ভাবনা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদের। তিনি চেয়েছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু পড়াশোনার জায়গা হবে না। এটি পরিবেশ সচেতনতার ক্ষেত্রেও একটি উদাহরণ হয়ে উঠবে। তবে কাজটা সহজ ছিল না। ১৪ তলায় বসাতে হবে সোলার প্যানেল, বিবেচনায় নিতে হবে অনেক কিছুই। বাতাসের চাপ, তাপমাত্রা, স্ট্রাকচারাল চ্যালেঞ্জ, নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে ছিল এক মহাযজ্ঞ। ২০২১ সালে কাজ শুরু হয়েছিল সোলার প্যানেল বসানোর। শেষ হয় ২০২৩ সালে।

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অফিস অব কমিউনিকেশনসের ডিরেক্টর খায়রুল বাশার বলেন, ‘আমরা চেয়েছি, এ ক্যাম্পাসটা টেকসই ভবিষ্যতের একটি বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠুক। আমাদের লক্ষ্য ছিল, শিক্ষার্থীদের এমন একটা ক্যাম্পাস দেয়া, যা তাদের পরিবেশ সংরক্ষণে আরো সচেতন এবং উৎসাহী করবে। আমরা গর্বিত যে আমরা তাদের সেই ধরনের একটা ক্যাম্পাস দিতে পেরেছি।’

এক জীবন্ত ল্যাবরেটরি

সোলার সিস্টেমটির দেখভাল করছে ১২ জনের একটি দল। প্রতিদিন মনিটরিং করা হয়। কোন প্যানেল ঠিকমতো কাজ করছে, কোনটা করছে না, কোথায় পরিষ্কার করা দরকার—সবকিছুই নজরে রাখা হয়। বর্ষাকাল বা মেঘলা দিনে উৎপাদন কমে গেলেও রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে এ প্যানেলগুলো ক্যাম্পাসের বড় ভরসা হয়ে ওঠে। এ উদ্যোগ শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না। এটি এখন হয়ে উঠেছে একটি ল্যাবরেটরি। ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং, আর্কিটেকচারসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরাও প্রতিনিয়ত আসছেন। তারা এর পরিচালনা পদ্ধতি দেখছেন। এটাকে আরো কীভাবে উন্নত করা যায় তা শিখছেন। অনেক শিক্ষার্থীর কাছে এটি এখন বাস্তব জীবনের একটি ‘লিভিং ল্যাব’।

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ও বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট সাদমান ইসলাম আলিফ বলেন, ‘আন্ডারগ্র্যাজুয়েটে আমাদের থিসিস প্রজেক্ট ছিল সোলার প্যানেল পরিষ্কার ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে। কারণ এত বড় সোলার সিস্টেম নিয়মিত পরিষ্কার ও মনিটরিং করা বেশ কঠিন এবং ব্যয়বহুল। আমরা একটি ক্লিনিং ডিভাইস ও থার্মাল পর্যবেক্ষণে সক্ষম ইউএভি তৈরি করেছিলাম। এ কাজে ইইই বিভাগের ফ্যাকাল্টিরা আমাদের গাইড করেছিলেন। পরে ১ দশমিক ৪ মেগাওয়াট সোলার সিস্টেমের জন্য ইন্ডাস্ট্রি-গ্রেড ক্লিনিং রোভার ও ইনস্পেকশন সিস্টেম নিয়ে গবেষণা ও উন্নয়নকাজ করার সুযোগও পাই।

কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী ইনজামামুল হক ফাহিম বলেন, ‘আমাদের নবায়নযোগ্য শক্তির গুরুত্ব এবং ব্যবহার সম্পর্কে আরো সচেতন হতে হবে। এ সোলার সিস্টেমটা আমাদের ভবিষ্যতের জ্বালানি ব্যবস্থার কথা মনে করিয়ে দেয়। ভাবতেই দারুণ লাগে যে আমাদের ক্যাম্পাসের বিদ্যুতের একটা বড় চাহিদা সোলার থেকে পূরণ হচ্ছে। সবার জন্য এটা অনুকরণীয় হতে পারে।’

আরও