বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য খাতের আমূল পরিবর্তন এবং প্রতিনিয়ত নতুন নতুন রোগ ও মহামারির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের চাহিদা এখন আকাশচুম্বী। আপনি যদি মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক স্বাস্থ্য বৈষম্য দূর করার স্বপ্ন দেখে থাকেন, তবে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে উচ্চশিক্ষা হতে পারে আপনার ক্যারিয়ারের শ্রেষ্ঠ মাইলফলক।
২০২৬ সালে হামের মহামারী আমাদের জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখায়। কডিড-১৯-পরবর্তী সময়ে মানুষের মধ্যে টিকাদান নিয়ে কিছু ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয়, যা হয়তো পরবর্তী সময়ে শিশুদের টিকা দেয়ার ব্যাপারে পিতা-মাতার মধ্যে নিরুৎসাহ তৈরিতে সাহায্য করেছে। টিকা ক্রয় থেকে শুরু করে বিতরণ ও টিকা প্রদান একটা বড় সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের বিষয়। এছাড়া হামের ভাইরাসের সেরোটাইপ বা ভ্যারিয়েন্টের মধ্যে কোনো পরিবর্তন হয়ে থাকতে পারে, যা বের করা গবেষণাসাপেক্ষ বিষয়। এ রকম পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাধীনতার পরপরই ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভেন্টিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিন (নিপসম) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশে হাসপাতালভিত্তিক রোগ প্রতিকারমূলক স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধমূলক বা প্রিভেন্টিভ মেডিসিনের যাত্রা শুরু হয়। বিভিন্ন মেডিকেলে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা ‘কমিউনিটি মেডিসিন’ নামে যে বিষয় পড়েন সেটিও মূলত রোগ প্রতিরোধবিষয়ক, কিন্তু মেডিকেল শিক্ষার্থীর সংখ্যা খুবই কম। পরবর্তী সময়ে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে জনসংখ্যা বিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্য-বিষয়ক আলাদা প্রোগ্রাম চালু করা হয়।
জনসংখ্যা বিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্য-বিষয়কে একই সঙ্গে বিবেচনা করে পপুলেশন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ সায়েন্সেস (পিপিএইচএস) নামে স্নাতক পর্যায়ে একটি ইউনিক প্রোগ্রাম চালু করে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি। পুরনো ও নতুন আবিষ্কৃত জনসংখ্যা, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সমস্যাগুলো এবং এ সমস্যার সমাধান, প্রতিকার ও প্রতিরোধের উপায় খুঁজে বের করার প্রয়াসেই এ প্রোগ্রাম।
বিশ্বে উন্নত দেশগুলোর তুলনায় দরিদ্র, অনুন্নত ও বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোয় জনসংখ্যা, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সমস্যাগুলো অনেক বেশি জটিল। এর সমাধানে মাল্টিডিসিপ্লিনারি জ্ঞান ও বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের ভূমিকার সমন্বয় প্রয়োজন। বর্তমান সময়ের প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম জলবায়ু পরিবর্তন, ঘন ঘন ও বৃহৎ পরিসরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দেশের অভ্যন্তরে বা দেশের বাইরে মাইগ্রেশন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়ন, পরিবেশদূষণ, বিভিন্ন রোগের মহামারী বা অতিমারীসহ অন্যান্য নতুন ও পুরনো রোগের প্রাদুর্ভাব ইত্যাদি। জনসংখ্যার অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি প্রাকৃতিক সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহার জীববৈচিত্র্য ও ইকোসিস্টেমের বিনাশ, দারিদ্র্য ও সামাজিক অসমতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও এর ফলে মানুষের নিজ ভূমি এবং বাসস্থান ছেড়ে রিফিউজি হিসেবে অন্যত্র চলে যাওয়া এ ধরনের সমস্যাগুলো আগে উল্লেখিত সমস্যার তালিকা আরো দীর্ঘায়িত করেছে। বেশি জটিল করে তুলেছে। এ সমস্যাগুলোর একটি অন্যটির সঙ্গে এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িত যে শুধু একটি সমস্যার একক সমাধান সম্ভব নয়। যেমন জনসংখ্যার অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি, সামাজিক, রাজনৈতিক, পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত বিষয়গুলো নেতিবাচক ভূমিকা পালন করে। কারণ এ বাড়তি জনসংখ্যা দেশের সীমিত ভূমির ওপর অত্যধিক চাপ ফেলে, মানুষ বন উজাড় করে বাসস্থান বানায়, ঘনবসতি তৈরি করে যার ফলে জীববৈচিত্র্য লোপ পায়। পরিবেশের দূষণ ঘটে, মাটি, পানি, বায়ু দূষিত হয়, খাদ্যাভাব দেখা দেয়, স্বাস্থ্যের অবনতি ও বিভিন্ন সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে তৈরি হয় নানা সমস্যা।
এ ধরনের নানামুখী ও বৈচিত্র্যপূর্ণ সমস্যায় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে টেকসই সমাধান খুঁজে পেতে হলে গবেষণালব্ধ জ্ঞানার্জনে কোনো একক ডিসিপ্লিনের পক্ষে সম্ভব নয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির পিপিএইচএস প্রোগ্রামটি মাল্টিডিসিপ্লিনারি আঙ্গিকে তৈরি করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের যে বিষয়গুলো শেখানো হয় তার মধ্যে অন্যতম রোগতত্ত্ব ও মহামারিবিদ্যা, স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান, গবেষণা পদ্ধতি, জনসংখ্যাতত্ত্ব, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশগত স্বাস্থ্য, সামাজিক ও আচরণগত বিজ্ঞান, সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগতত্ত্ব, পেশাগত স্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যবিষয়ক যোগাযোগ, প্রজনন স্বাস্থ্য, নগরায়ণ, শিল্পায়ন, মাইগ্রেশন বিষয়ক কোর্স, নগর স্বাস্থ্য, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ মোকাবেলা, বৈশ্বিক জলবায়ুজনিত সমস্যা ও সমাধান, মনিটরিং ও ইভ্যালুয়েশন এবং পরিবার পরিকল্পনা ইত্যাদি।
গ্র্যাজুয়েশন শেষে শিক্ষার্থীদের জনসংখ্যা ও জনস্বাস্থ্য-বিষয়ক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। দেশের ভেতরে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও রয়েছে কাজের সুযোগ, বিসিএস দিয়ে সরকারি ক্যাডারভুক্ত চাকরিতে যোগদান করাও যাবে। দেশী-বিদেশী বিভিন্ন জনসংখ্যা, জনস্বাস্থ্য, উন্নয়ন, শিক্ষা, দারিদ্র্য বিমোচন ইত্যাদি বিষয়ক সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ রয়েছে। গবেষক বা শিক্ষক হিসেবে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা ইউনিভার্সিটিতে যোগদান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, ইউএনএফপিএ, ইউএনএআইডিএস, সেভ দ্য চিলড্রেন, কেয়ার, কনসার্ন, এমএসএফ ও আইএলও ইত্যাদি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাজের সুযোগ রয়েছে।
এছাড়া দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষার জন্য বিখ্যাত ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। জনসংখ্যা, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ মোকাবেলা ইত্যাদি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে স্কলারশিপের সুযোগ বর্তমানে অনেক বেশি।
ডা. মারজিয়া জামান সুলতানা: সিনিয়র লেকচারার, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি