তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি থেকে মহামারিবিদ্যায় পিএইচডি ও হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি থেকে জনস্বাস্থ্য শিক্ষায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। জনস্বাস্থ্য শিক্ষার গুরুত্ব, ক্যারিয়ার সম্ভাবনা, মহামারী বা প্রাদুর্ভাব নিয়ে গবেষণাসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শফিকুল ইসলাম
বাংলাদেশে সম্প্রতি হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক আকার নিয়েছে। একজন মহামারীবিদ হিসেবে এ পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
বর্তমানে হামের প্রাদুর্ভাবকে আমি জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি প্রতিরোধযোগ্য মহামারী হিসেবে দেখি। সঠিক সময়ে সঠিক ব্যবস্থার মাধ্যমে এটি প্রতিরোধ করা যেত। হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। এ রোগটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে টিকাদানের উচ্চ কাভারেজ (৯০%) বজায় রাখা জরুরি। টিকাদানের কাভারেজ সামান্য কমলেও রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। কভিড-১৯-পরবর্তী সময়ে রুটিন ইমিউনাইজেশন কিছুটা বিঘ্নিত হওয়া, জনগণের মাঝে টিকাদানে অনীহা বা ভুল ধারণার সৃষ্টি, কিছু এলাকায় সেবার অপ্রতুলতা এবং টিকা কাভারেজ ও রোগ পরিবীক্ষণের স্বল্পতা—এসব মিলিয়ে হয়তো এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে ইতিবাচক দিক হলো দ্রুত পদক্ষেপ নিলে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
জনস্বাস্থ্য শিক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে জানতে চাই—বাংলাদেশে মহামারী বা প্রাদুর্ভাব মোকাবেলার জন্য দক্ষ জনবল কি যথেষ্ট? ঘাটতি থাকলে সেটা কোথায়?
বাংলাদেশে দক্ষ জনস্বাস্থ্য জনবল রয়েছে, তবে প্রয়োজনের তুলনায় তা এখনো অপর্যাপ্ত। বিশেষ করে ফিল্ড এপিডেমিওলজি, ডেটা অ্যানালিটিকস এবং রিয়েল-টাইম সার্ভেইলেন্সে জনবল ও দক্ষতার ঘাটতি আছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষিত জনবল আরো বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে গবেষণা ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করাও জরুরি। বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য ও রোগীসেবা একই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচালিত হয়, আমি মনে করি জনস্বাস্থ্য সেবা আলাদা অধিদপ্তরের মাধ্যমে পরিচালিত হলে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে জনস্বাস্থ্য শিক্ষা প্রোগ্রামের বিশেষত্ব কী? কী কী কোর্স পড়ানো হয়?
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের জনস্বাস্থ্য শিক্ষা একটি মাল্টিডিসিপ্লিনারি অ্যাপ্রোচ অনুসরণ করে। এখানে জনস্বাস্থ্য অনুশীলন করার জন্য প্রয়োজনীয় সব বিষয়, যেমন এপিডেমিওলজি, বায়োস্ট্যাটিস্টিকস, গবেষণা পদ্ধতি, যোগাযোগ (কমিউনিকেশন), হেলথ পলিসি, এনভায়রনমেন্টাল হেলথ, নিউট্রিশন, সংক্রামক রোগ, অসংক্রামক রোগ এবং হেলথ সিস্টেম ম্যানেজমেন্টের মতো কোর্স পড়ানো হয়। শিক্ষার্থীরা শুধু তত্ত্ব নয়, বাস্তবভিত্তিক সমস্যা সমাধানের দক্ষতাও অর্জন করে।
বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য শিক্ষায় পড়াশোনা শেষে পেশা হিসেবে ক্যারিয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?
বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য পেশার চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। সরকারি সংস্থা, এনজিও, আন্তর্জাতিক সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং একাডেমিয়ায় কাজের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে মহামারী মোকাবেলা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং গবেষণায় দক্ষ জনবলের চাহিদা বাড়ছে, ভবিষ্যতে আরো বাড়বে। এছাড়া সারা বিশ্বে জনস্বাস্থ্য পেশার প্রভূত চাহিদা রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন পাবলিক হেলথ গ্র্যাজুয়েট জনস্বাস্থ্যের জন্য কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে?
একজন পাবলিক হেলথ গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন, গবেষণা, নীতিনির্ধারণ, রোগ সার্ভেইল্যান্স, এবং মনিটরিং—সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন টিকাদান কর্মসূচির মতো জনস্বাস্থ্য-বিষয়ক সব কর্মসূচি শক্তিশালী করা, রোগ নজরদারি উন্নত করা, স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, এবং ডেটানির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করা—এসব ক্ষেত্রে তাদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির স্কুল অব হেলথ অ্যান্ড লাইফ সায়েন্সেস এ মুহূর্তে জনস্বাস্থ্য শিক্ষায় কোন কোন দিককে অগ্রাধিকার দিচ্ছে? মহামারিবিদ্যা ও রোগ নজরদারির মতো বিষয়গুলো পাঠ্যক্রমে কতটা জায়গা পাচ্ছে?
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির স্কুল অব হেলথ অ্যান্ড লাইফ সায়েন্সেসের আওতাধীন পাবলিক হেলথ ডিপার্টমেন্ট বর্তমানে এপিডেমিওলজি, বায়োস্ট্যাটিস্টিকস, গবেষণা পদ্ধতি, যোগাযোগ, হেলথ পলিসি, এনভায়রনমেন্টাল হেলথ, নিউট্রিশন, সংক্রামক রোগ, অসংক্রামক রোগ এবং হেলথ সিস্টেম ম্যানেজমেন্টের মতো কোর্স পড়ানো হয়। মহামারিবিদ্যা আমাদের কারিকুলামের একটি প্রধান অংশ, যেখানে শিক্ষার্থীরা আউটব্রেক ইনভেস্টিগেশন, সার্ভেইল্যান্স সিস্টেমস, ডেটার ব্যাখ্যার ওপর প্রশিক্ষণ পায়। আমরা শিক্ষার্থীদের বাস্তব পরিস্থিতিতে কাজ করার মতো দক্ষতা গড়ে তুলতে গুরুত্ব দিচ্ছি। আমাদের শিক্ষার্থীরা প্রতি সেমিস্টারে দেশে ও বিদেশে মাঠ পর্যায়ে বাস্তব প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন।
জনস হপকিন্স ও হার্ভার্ডে প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা আপনার গবেষণা ও শিক্ষাদান পদ্ধতিতে কীভাবে প্রভাব ফেলেছে? দেশের বাস্তবতায় কোন চ্যালেঞ্জগুলো সবচেয়ে বড়?
জনস হপকিন্স ও হার্ভার্ডের প্রশিক্ষণ আমাকে উচ্চ মানসম্পন্ন শিক্ষাদান ও গবেষণা সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ জ্ঞান প্রয়োগে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে—যেমন সীমিত সম্পদ, ডেটার মান ও প্রাপ্যতা এবং সিস্টেমিক সমন্বয়ের ঘাটতি। তবু স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ অভিজ্ঞতাকে আমরা কাজে লাগিয়ে যাচ্ছি। এক্ষেত্রে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজ, ভাইস চ্যান্সেলর, অন্যান্য কর্তৃপক্ষ এবং সহকর্মীরা সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করে থাকেন।
বর্তমানে এনএসইউর পাবলিক হেলথ বিভাগ হাম নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করছে। এ গবেষণা কার্যক্রম নিয়ে জানতে চাই।
বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব ও টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে আমাদের একাধিক গবেষণা চলমান রয়েছে। কার্যক্রম এখনো শেষ হয়নি। একটি গবেষণায় আমরা দেখতে চাচ্ছি, যেসব শিশু হামে ভুগছে, তাদের মধ্যে শতকরা কতজন হামের টিকা নিয়েছে এবং হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে যারা টিকা নিয়েছে এবং যারা নেয়নি তাদের মধ্যে জটিলতার কোনো পার্থক্য আছে কিনা। অন্য একটি গবেষণায় আমরা দুর্গম এলাকায় টিকা কাভারেজ এবং টিকাদান কার্যক্রমের সুযোগ-সুবিধা কেমন তা যাচাই করব। এ গবেষণার ফল ভবিষ্যতে আরো কার্যকর প্রতিরোধ কৌশল গ্রহণে সহায়ক হবে।