বাংলাদেশ ব্যাংক, দেশের সব তফসিলি ব্যাংক ও সরকার যৌথভাবে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করছে, যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে থাকা দেশের তিন কোটি মানুষকে ব্যাংকিং সুবিধার আওতায় নিয়ে আসা।
তবে এ আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন ভিত্তি কেবল প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে শ্রেণীকক্ষ থেকেই শুরু করা প্রয়োজন।
যদি একজন শিক্ষার্থী স্কুলে থাকাকালীন ব্যাংকিং লেনদেন, ডিজিটাল ওয়ালেটের নিরাপদ ব্যবহার ও বীমা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পায়, তবে জাতীয় পর্যায়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সহজ হবে। অন্যথায় আর্থিক সাক্ষরতা জ্ঞান থেকে বঞ্চিত ৭২ শতাংশ জনগোষ্ঠীর মধ্যে দ্রুত আর্থিক শিক্ষা পৌঁছে দেয়ার প্রক্রিয়াটি কঠিন হয়ে পড়বে। যেসব দেশে স্কুল পর্যায়ে আর্থিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক, সেখানে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সুশৃঙ্খল সঞ্চয়ী হয়ে গড়ে ওঠার প্রবণতা অনেক বেশি; এক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো একটি জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এ আর্থিক সাক্ষরতাকে কেবল একটি অতিরিক্ত বিষয় হিসেবে না দেখে, এটিকে বিদ্যমান পাঠ্যসূচির সঙ্গে কার্যকর পদ্ধতিতে সমন্বিত করা প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, গণিতের সমস্যাগুলোয় সেভিংস স্কিম, শেয়ারবাজার, কম্পাউন্ড ইন্টারেস্ট বা কর (ট্যাক্স) ক্যালকুলেশনের বাস্তব উদাহরণ যুক্ত করা যেতে পারে। প্রতিটি স্কুলে ব্যাংকগুলোর সহযোগিতায় ‘স্কুল ব্যাংকিং উইন্ডো’-এর মাধ্যমে হাতেকলমে সঞ্চয়ের শিক্ষা দেয়া যেতে পারে, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত সর্বশেষ ‘স্টুডেন্ট ব্যাংকিং গাইডলাইনস’ একটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিল রেখে শিক্ষার্থীদের জন্য কাল্পনিক বাজেট তৈরি বা ‘মক ইনভেস্টমেন্ট’ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যেতে পারে। এছাড়া ফিনটেক এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তির প্রাথমিক ও নৈতিক ধারণা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা, অনলাইন গেমের মাধ্যমে আর্থিক শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরা এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এ যুগে ডেটা সায়েন্স, এআইয়ের নৈতিক ব্যবহার, গ্রিন ব্যাংকিং ও ক্লাইমেট ফাইন্যান্সের মতো বিষয়গুলো যুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও করপোরেট জগতের মধ্যে বর্তমানে যে বিশাল দূরত্ব বিদ্যমান, তা ঘোচাতে ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ইন্টার্নশিপ বা মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম চালু করতে পারে।
পরিশেষে, ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষা ব্যবস্থাকে আমরা কেবল ‘বিদেশে যাওয়ার পাসপোর্ট’ হিসেবে না দেখে একে দেশের দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলতে পারি এবং আর্থিক সাক্ষরতাকে কেবল অর্থের হিসাব করা নয়, বরং এটিকে সুন্দর ও সুশৃঙ্খল জীবনের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
এমএম মাহবুব হাসান: ব্যাংকার, উন্নয়ন গবেষক ও লেখক