ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াশোনা, শিক্ষাক্রম ও আন্তর্জাতিক এ শিক্ষা ব্যবস্থার নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শফিকুল ইসলাম
বাংলাদেশের বর্তমান ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা ব্যবস্থার (কেমব্রিজ/এডেক্সেল) মানকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
বর্তমান ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত ব্রিটিশ কাউন্সিল দ্বারা পরিচালিত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শিক্ষা ব্যবস্থা, যা শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক মানের শিক্ষা প্রদান করে দেশে বা বহির্বিশ্বে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করে। এ কারিকুলামগুলো শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি বিশ্লেষণাত্মক ও প্রায়োগিক দক্ষতা, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং সমস্যা সমাধানের ওপরও জোর দেয়। তাই ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে দাঁড়াতে একটি সুদৃঢ় ভিত্তি প্রদান করে।
সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা আছে যে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা দেশীয় সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যায়। এ কারিকুলামে দেশের শেকড়ের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের যুক্ত রাখার জন্য কী ব্যবস্থা আছে?
ব্রিটিশ কারিকুলাম অনুসরণ করা সত্ত্বেও দেশীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস ও বাংলা ভাষার সঙ্গে সংযুক্ত করার লক্ষ্যে সারা বছর আমরা বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকি। প্লে গ্রুপ থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত বাংলা ভাষাকে অন্যতম প্রধান আবশ্যিক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উদযাপনের মাধ্যমে বাংলা ভাষায় গান, কবিতা, রচনা প্রভৃতি ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করতে উৎসাহ প্রদান করে থাকি। বাংলা বই পড়ায় উৎসাহিত করতে শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ‘লাইব্রেরি ক্লাস’ রয়েছে। জাতীয় দিবসগুলো পালনের পাশাপাশি এর তাৎপর্য উপস্থাপন করি, শিক্ষা সফরের আয়োজন করে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন জাদুঘর, ঐতিহাসিক স্থানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই।
জাতীয় শিক্ষাক্রমের সঙ্গে ইংরেজি মাধ্যমের মূল পার্থক্য কোথায় বলে আপনি মনে করেন? মুখস্থবিদ্যার বদলে প্রায়োগিক ও বিশ্লেষণধর্মী শিক্ষার যে কথা বলা হয়, সেটি আপনারা শ্রেণীকক্ষে কীভাবে নিশ্চিত করছেন?
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও ইংরেজি মাধ্যমের পার্থক্য মূলত পাঠ্যক্রমের মূল্যায়ন পদ্ধতি ও প্রায়োগিক দর্শনে। ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে, জাতীয় শিক্ষাক্রম যোগ্যতাভিত্তিক ও প্রায়োগিক দক্ষতার ওপর জোর দান করছে। অন্যদিকে ইংরেজি মাধ্যম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও সমালোচনামূলক এবং বিশ্লেষণ ও গবেষণাধর্মী চিন্তাভাবনাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। আমাদের শ্রেণীকক্ষে মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরতা কমাতে বেশকিছু পদক্ষেপ অনুসরণ করে আসছি। যেমন তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষণ বা হাতে-কলমে শেখার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছি। বাস্তব জীবনে সমস্যা সমাধানের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প ও দলীয় কার্যক্রম এবং বিজ্ঞান মেলা, ধাঁধা প্রতিযোগিতার আয়োজন করছি। শুধু বার্ষিক পরীক্ষার ওপর নির্ভর না করে শ্রেণীর কার্যক্রম ও সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে নিয়মিত দক্ষতা ও অগ্রগতি যাচাই করি।
অনেকেই মনে করেন ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা শুধু বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্যই প্রস্তুত হয়। যারা দেশে পড়তে চায় তাদের জন্য এ সিলেবাস কতটা সহায়ক?
আমি তা মনে করি না। অনেক সময় অভিভাবকদের চাহিদা থাকে যেন ভবিষ্যতে তাদের সন্তান বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের উপযুক্ত বা পারদর্শী হতে পারে। কিন্তু তাই বলে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থী যে দেশের পাবলিক বা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে পারবে না এমন কোনো বিষয় নেই। যেহেতু জাতীয় শিক্ষাক্রমের সঙ্গে ব্রিটিশ কাউন্সিলের সিলেবাসের কিছুটা তারতম্য রয়েছে, তাই অতিরিক্ত কিছু বিষয়ে দক্ষতা অর্জনে শিক্ষার্থীদের ছয় মাসের বিশেষ কোর্স করতে হয়। বর্তমানে আমাদের একাধিক শিক্ষার্থী সাফল্যের সঙ্গে বুয়েট, কুয়েট ও আইবিএতে অধ্যয়ন করছে।
ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষার্থীরা কোথায় ক্যারিয়ার গড়েন?
দেশের করপোরেট সেক্টরে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের ভালো চাহিদা আছে। কারণ হলো তাদের ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা, যা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, এনজিও, ব্যাংক ও আইটি খাতে অপরিহার্য। পারিশ্রমিকও একটা বিশাল ভূমিকা রাখে। শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার গড়তে মূলত ভাষাগত দক্ষতা আরো সমৃদ্ধ করে গ্লোবাল ক্যারিয়ার, পাবলিক রিলেশন, প্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিং, ব্যবসা প্রভৃতি ক্ষেত্রে পরামর্শ দেয়া হয়। শিক্ষার্থীদের অধিকাংশ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষকতা, এনজিও, মিডিয়া ও বিজ্ঞাপন, ফ্রিল্যান্সিংয়ে তাদের ক্যারিয়ার গড়ে থাকে। একটি বড় অংশ উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে চলে যায়।
ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোয় উচ্চ খরচের কারণ কী?
আমাদের স্কুলে মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত উভয় পরিবারের শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। আমাদের স্কুলের বার্ষিক ফি ও মাসিক বেতন অন্যান্য অনেক স্কুলের তুলনায় কম হওয়ায় অভিভাবকরা সন্তুষ্ট। তবে উচ্চ খরচের পেছনে মূল কারণ হিসেবে আমি বলব, ব্রিটিশ কাউন্সিলের পরীক্ষার ফি, যা বৈদেশিক মুদ্রায় নির্ধারণ করা হয়, সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক কারিকুলামের আমদানীকৃত বইয়ের দাম অনেকের জন্য যথেষ্ট ব্যয়বহুল।
আর্থিকভাবে অসচ্ছল কিন্তু অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য আপনাদের স্কুলে বা সার্বিকভাবে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোতে স্কলারশিপ সুযোগ আছে কি?
আমাদের স্কুলে আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য সাধারণত ১০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ বেতন ও অন্যান্য ফি মওকুফ করা হয়ে থাকে। এছাড়া আমাদের স্কুলে দুজনের অধিক ভাইবোন অধ্যয়ন করলে তৃতীয়জনকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অধ্যয়নের সুযোগ দেয়া হয়। আমার জানামতে, অন্যান্য অনেক স্কুলে মেধার ভিত্তিতে ওয়েভার ও স্কলারশিপ প্রদান করা হয়।
দেশের ইংরেজি মাধ্যম স্কুল কোনো সরকারি নীতিমালা ও মনিটরিংয়ের মধ্যে নেই। সরকার একটি নীতিমালার মধ্যে নিয়ে আসার কথা ভাবছে। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
বর্তমানে সরকারি নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সরকারের এ পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানাই। সেই সঙ্গে যেসব নীতি কার্যকর করার প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তবে কারিকুলাম ভিন্ন বিধায় এমনভাবে নীতিমালা তৈরি করতে হবে যা শিক্ষার গুণগত মানকে অক্ষুণ্ন রাখবে এবং সেই সঙ্গে জাতীয় নিয়ন্ত্রণও নিশ্চিত হবে। এ নীতিমালা যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি করতে না পারে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।
ইংরেজি মাধ্যমে পড়াতে আগ্রহী অভিভাবকদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
স্কুলের মান সম্পর্কে নিশ্চিত হোন। শিক্ষকমণ্ডলীর পারদর্শিতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত, স্কুলের নৈতিক পরিবেশ যাচাই করুন। মাতৃভাষা ও ইংরেজি উভয় ভাষা চর্চার সুযোগ করে দিন ও উভয় ভাষা ব্যবহারে দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করুন। সন্তানকে মানসিক চাপমুক্ত রাখুন। পড়াশোনার পাশাপাশি সৃজনশীলতার চর্চা, খেলাধুলা, বিভিন্ন এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজে যোগ দিতে উৎসাহিত করুন।