এ জায়গাটিই সেই কেন্দ্র, যেখানে রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকার মানববর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাত করা হয়। বাইরে থেকে এটি শুধু একটি শিল্প ফ্যাসিলিটি মনে হলেও ভেতরে এটি যেন এক জটিল, জীবন্ত সিস্টেম, যা প্রতিনিয়ত হাজার হাজার মানুষের জীবনকে নিরাপদ রাখার জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা যখন সেখানে পৌঁছেন, তখন এটি তাদের জন্য শুধু একটি জায়গা পরিদর্শন নয়, বরং বাস্তব জীবনের এক অজানা অধ্যায়ের দরজা খুলে যাওয়ার মতো অভিজ্ঞতা। পরিকল্পনার বইয়ে দেখা মানচিত্র, ডায়াগ্রাম, ডেটা বিশ্লেষণ আর তাত্ত্বিক ধারণাগুলো হঠাৎ করেই চোখের সামনে বাস্তব রূপে দাঁড়িয়ে যায়। যেসব সমস্যা তারা ক্লাসে কাগজে-কলমে সমাধান করে, সেগুলোই এখানে হাজার মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে কাজ করছে।
২০১৭ সালে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আগমনের পর থেকে এ পুরো অঞ্চল দ্রুতই একটি ঘনবসতিপূর্ণ মানব বসতিতে পরিণত হয়। বর্তমানে দুই লক্ষাধিক মানুষের বসবাস, ৩৩টি ক্যাম্প এবং প্রতিদিনের বিশাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ এখানে কাজ করছে। শুরুতে অবস্থা ছিল অত্যন্ত কঠিন—কাঁচা রাস্তা, অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য নিষ্কাশন এবং সীমিত শৌচ ব্যবস্থা পুরো পরিবেশকে জটিল করে তুলেছিল।
চুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষার্থীরা দেখেন কীভাবে একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সীমিত সম্পদ ও অবকাঠামোর মধ্যেও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষার চেষ্টা করা হচ্ছে। পাইপলাইন নেটওয়ার্ক, ট্রিটমেন্ট ইউনিট এবং সমন্বিত অপারেশন মিলিয়ে পুরো সিস্টেমটি একটি চলমান নগর ব্যবস্থাপনার বাস্তব উদাহরণ হিসেবে তাদের সামনে ধরা দেয়।
ফ্যাসিলিটির ভেতরে দেখা যায়, ক্যাম্প থেকে সংগৃহীত বর্জ্য একটি সমন্বিত পাইপলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে কেন্দ্রীভূত ট্রিটমেন্ট সিস্টেমে আনা হয়। ধাপে ধাপে প্রবাহিত এ বর্জ্য নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্দিষ্ট স্থানে প্রক্রিয়াজাত করা হয়, যেখানে প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা হয়। তবে এ ব্যবস্থার ভেতরেও রয়েছে বাস্তব চ্যালেঞ্জ। বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে সিস্টেমে চাপ বেড়ে যায়, প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে এবং দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণ ও ধারাবাহিক প্রসেসিং বজায় রাখা চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে। শুরুতে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক কাজ ম্যানুয়ালি করতে হতো, যা ছিল সময়সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য। তবুও সময়ের সঙ্গে পাইপলাইনভিত্তিক এ সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে এখন অনেক কাজ আরো স্বয়ংক্রিয় ও নিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে, ফলে পুরো সিস্টেমটি আরো কার্যকর ও টেকসই হয়ে উঠেছে।
নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষার্থী আহমেদ ওয়াহিব মুনতাকিম বলেন, কীভাবে এত মানুষের বর্জ্য একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে তা সরাসরি দেখতে পারাটা একটা দারুণ অভিজ্ঞতা ছিল। এই যে অভিজ্ঞতা অর্জন করলাম, সেটি বইয়ের পাতা উল্টিয়ে বোঝার চেয়ে হাজার গুণ ভালো।
নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ফওজিয়া গুলশানা রশিদ লোপা বলেন, ‘এ কোর্সের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে শিক্ষার্থীদের জন্য বাস্তব অভিজ্ঞতার সুযোগ তৈরি করা। তারা এতদিন যেসব বিষয় তাত্ত্বিকভাবে শিখেছে, এখানে এসে সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ দেখতে পারছে। পাশাপাশি পরিকল্পনা খাতে কী ধরনের কাজ হয়, কোন কোন প্রতিষ্ঠান ও সেক্টর একসঙ্গে কাজ করে, সেসব সম্পর্কেও ধারণা পাচ্ছে। ’
জারীন তাসমীন সাবা: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়