ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কয়েকটি স্থাপত্য ও ভাস্কর্য রয়েছে। যার মধ্যে শহীদ স্মৃতিসৌধ অন্যতম। এর শৈল্পিক কারুকার্য আর মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য খুব সহজেই মানুষের নজর কাড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্ত সাহিত্য চর্চার স্থান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রত্যয়ে শহীদ স্মৃতিসৌধ স্থাপিত হয়।
৫২’ র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৭১ এর গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধসহ সকল গণতান্ত্রিক সংগ্রামের শহীদদের স্মরণে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ২০০১ সালে তাৎপর্যপূর্ণ এই শহীদ স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন, খ্যাতিমান শিল্পী হাশেম খান ও অরক্ষিত স্থাপত্যবিদ রবিউল ইসলামের দেয়া নকশা ও স্থাপত্যকর্মের ভিত্তিতে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়।
১৯৯৯ সালের ৫ ডিসেম্বর এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় এবং ২০০১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি এর উদ্বোধন হয়। উদ্বোধন করেন তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী এ এস এইচ কে সাদেক। ৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা লাভের মূল ধারা ও অতীতের প্রেক্ষাপটকে স্মরণ রাখতে যথাক্রমে ৩০ ফুট, ৪২ ফুট ও ৫২ ফুট উচ্চতায় ২ ফুট ৬ ইঞ্চি পুরু বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের সংমিশ্রণে এই স্মৃতিস্তম্ভটি স্থাপিত হয়। ৭১ ফুট উঁচু পরিসরে ৩ ফুট ৯ ইঞ্চি থেকে ৫ ফুট ৯ ইঞ্চি উচ্চতা বিশিষ্ট ইটের স্তম্ভে এ স্মৃতিস্তম্ভটি স্থাপিত। যার ওপর বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মঞ্চ, পুষ্পর্পণের বেদি, প্রশস্ত পাটাতন, মাঝখানে ২১ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট জাতীয় পতাকার দণ্ড এবং দুইপাশে ১০ ফুট উচ্চতার ৩৮ ফুট ৬ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা বিষয়ক দুটি দেয়ালচিত্র রয়েছে। পোড়ামাটিতে মাছ, পাখি, একতারা, শাপলাসহ নানান ফুল পাতার চিত্র অঙ্কিত আছে এখানে। যা বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছে।
পাখির চোখে ইবির শহীদ স্মৃতিসৌধ। ছবি- সংগৃহীত
দেয়ালচিত্রে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মরমী কবি লালন শাহ, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, পাগলা কানাইয়ের বাণী সংযোজনে স্মৃতিসৌধটির গুরুত্ব আরো অর্থবহ হয়ে ওঠেছে। এখানে সংযোজিত কিছু বাণীর মধ্যে— বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘তোমরা ভয় দেখিয়ে করছো শাসন, জয় দেখিয়ে নয়, সেই জয়ের টুটিই ধরবে টিপে, করব তারে লয়’, লালন ফকিরের ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে, লালন বলে জাতের কী রূপ দেখলাম না এ নজরে’, মীর মশাররফ হোসেনের ‘বাংলা ভাষায় যাহার ভক্তি নাই, সে মানুষ নহে’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’, পাগলা কানাইয়ের ‘শত রঙের দেখিরে গাভী, এবা রঙের দুধ গো দেখি, তবে কেন ত্রিজগতে মানবিচ করত্যাচি’ বাণীগুলো স্মৃতিসৌধের সৌন্দর্যকে শতগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া স্মৃতিসৌধের গোলাকার জ্যামিতিক বৃত্ত, ব্যাসার্ধ, স্থাপত্য ইত্যাদি আমাদের দেশের বিভিন্ন ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে মনে করিয়ে দেয়।
স্মৃতিসৌধটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পশ্চিম পাশে অবস্থিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক অতিক্রম করে বাম দিকে তাকালেই চোখে পড়বে অনন্য সুন্দর এই স্থাপত্যটি। জাতীয় দিবসগুলোয় পুষ্পস্তবক অর্পণ ও অন্যান্য সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আড্ডা দেয়ার প্রাণকেন্দ্র এটি।
ছবি- সংগৃহীত
স্মৃতিসৌধের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়া গাছটিতে যখন ফুল ফোটে, তখন মনে হয় এটিই যেন দেশপ্রেমের এক নীরব সাক্ষী। যেটি স্মৃতিসৌধের সৌন্দর্যের সঙ্গে মিলে এক অনন্য দৃশ্য তৈরি করে। কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম আভা যেন আমাদের শহীদদের আত্মত্যাগের গল্পই মনে করিয়ে দিয়ে যায়। স্মৃতিসৌধের ওপর যখন সন্ধ্যার ছায়া নামে, তখন মনে হয় ইতিহাসের কালো অধ্যায়গুলো যেন আমাদের হাতছানি দেয়।
স্মৃতিসৌধ শুধু আমাদের অতীতের স্মারক নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যতের পথ চলার অনুপ্রেরণা। সেই অনুপ্রেরণাই প্রতীক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ স্মৃতিসৌধ।
লেখা: উম্মে মাহিমা হিমা
শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।