ইংলিশ মিডিয়াম: বাংলাদেশী শিক্ষা ব্যবস্থায় ‘ও’ লেভেল ‘এ’ লেভেল

বৈশ্বিক শিক্ষার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশে ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষা ব্যবস্থার বিস্তার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে।

বর্তমানে দেশে আনুমানিক আড়াই থেকে তিন লাখ শিক্ষার্থী ইংলিশ মিডিয়াম কারিকুলামে অধ্যয়ন করছে এবং ৩০০-এরও বেশি নিবন্ধিত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যার অধিকাংশই ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার ক্রমবর্ধমান আকাঙ্ক্ষা এ প্রবণতাকে আরো ত্বরান্বিত করছে।

ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো ‘ও’ লেভেল (অর্ডিনারি লেভেল) এবং ‘এ’ লেভেল (অ্যাডভান্সড লেভেল)। ‘ও’ লেভেল সাধারণত মাধ্যমিক স্তরের সমমান, যেখানে শিক্ষার্থীরা ৪০টিরও বেশি বিষয়ের মধ্য থেকে ৫-১২টি বিষয় নির্বাচন করে। অন্যদিকে ‘এ’ লেভেল উচ্চমাধ্যমিক স্তরের সমতুল্য এবং এখানে শিক্ষার্থীরা সাধারণত দুই-পাঁচটি বিষয় বেছে নেয়, যা নির্ভর করে তাদের ভবিষ্যৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা, ব্যক্তিগত আগ্রহ ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের প্রাপ্যতার ওপর।

বাংলাদেশে প্রতি বছর আনুমানিক ৭-১০ হাজার শিক্ষার্থী ‘ও’ লেভেল এবং চার-ছয় হাজার শিক্ষার্থী ‘এ’ লেভেল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে, যা এ শিক্ষাধারার ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার প্রতিফলন। ইংলিশ মিডিয়াম কারিকুলামের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর ধারণাভিত্তিক ও বিশ্লেষণধর্মী শিক্ষা পদ্ধতি। এখানে মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে বোঝাপড়া, যুক্তি বিশ্লেষণ এবং সমস্যা সমাধান দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। শিক্ষার্থীদের কেবল তথ্য জানা নয়, বরং সে তথ্যের প্রয়োগ ও ব্যাখ্যা করার সক্ষমতা অর্জনই এ পদ্ধতির মূল লক্ষ্য।

এছাড়া বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে নমনীয়তা এ কারিকুলামের একটি বড় শক্তি। বিজ্ঞান, বাণিজ্য বা মানবিক যেকোনো ধারার শিক্ষার্থী নিজের আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিষয় নির্বাচন করতে পারে। ইংলিশ মিডিয়ামের পাঠ্যবইগুলো আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এবং নিয়মিতভাবে হালনাগাদ করা হয়। এসব বইয়ে বাস্তব জীবনের উদাহরণ, গবেষণাভিত্তিক তথ্য, গ্রাফ ও ডেটা বিশ্লেষণ অন্তর্ভুক্ত থাকে, যা শিক্ষার্থীদের গভীরভাবে বিষয়টি বোঝার সুযোগ দেয়। ফলে শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, বরং বাস্তব জীবনে জ্ঞান প্রয়োগের জন্যও প্রস্তুত হয়।

বাংলাদেশে ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষা ব্যবস্থা প্রধানত কেমব্রিজ অ্যাসেসমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন ও পিয়ারসন এডেক্সেল বোর্ডের অধীনে পরিচালিত হয়। এ বোর্ডগুলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং তাদের সনদ বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গ্রহণযোগ্য। ফলে শিক্ষার্থীরা সহজেই বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়ে থাকে। ও/এ লেভেল পরীক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ‘অদেখা প্রশ্ন’ পদ্ধতি, যা শিক্ষার্থীর প্রকৃত বোঝাপড়া ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা যাচাই করে। বছরে সাধারণত দুটি প্রধান পরীক্ষা সেশন অনুষ্ঠিত হয়—মে/জুন ও অক্টোবর/নভেম্বর। পরীক্ষাগুলো লিখিত হলেও কিছু বিষয়ের ক্ষেত্রে প্র্যাকটিক্যাল ও কোর্সওয়ার্ক অন্তর্ভুক্ত থাকে। উত্তরপত্র আন্তর্জাতিক পরীক্ষকদের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়, যা একটি নিরপেক্ষ ও মানসম্মত গ্রেডিং নিশ্চিত করে।

বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষাক্রমের সঙ্গে ইংলিশ মিডিয়াম কারিকুলামের বেশকিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। জাতীয় কারিকুলামে যেখানে পাঠদান অনেকাংশে মুখস্থনির্ভর, সেখানে ইংলিশ মিডিয়ামে বিশ্লেষণধর্মী শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়া হয়। ভাষাগত পার্থক্যও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—ইংলিশ মিডিয়ামে সম্পূর্ণ ইংরেজিতে পাঠদান হওয়ায় শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বেশি প্রস্তুত থাকে। উল্লেখযোগ্যভাবে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলা মাধ্যম ও ইংলিশ ভার্সনের অনেক শিক্ষার্থী সপ্তম-দশম শ্রেণী শেষে ইংলিশ মিডিয়ামে স্থানান্তর হচ্ছে, যাতে তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

ও/এ লেভেল শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সুবিধা পায়। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় তাদের গ্রহণযোগ্যতা বেশি। একই সঙ্গে দেশের ভেতরেও তারা সফলতার স্বাক্ষর রাখছে। ঢাবি, বুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানে ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষার্থীদের সাফল্য ক্রমবর্ধমান। এছাড়া এ ধারার অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তী সময়ে গবেষণা, করপোরেট খাত ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

বাংলাদেশে ইংলিশ মিডিয়ামের ‘ও’ লেভেল ও ‘এ’ লেভেল শিক্ষা ব্যবস্থা এখন একটি সুপ্রতিষ্ঠিত এবং ক্রমবর্ধমান শিক্ষাধারা। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, বিষয়ের গভীরতা, নমনীয়তা ও দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতির কারণে এটি শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখছে। তবে যেকোনো শিক্ষা ব্যবস্থায় সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো শিক্ষার্থীর পরিশ্রম, আগ্রহ ও সঠিক দিকনির্দেশনা। সঠিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির মাধ্যমে যেকোনো শিক্ষার্থীই তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম।

অশোক কুমার অধিকারী: সিনিয়র এ লেভেল গণিত শিক্ষক, মাস্টারমাইন্ড ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল

আরও