বই কেনার ভিড়ের মাঝেই মেলার এক কোণে প্রতিদিন বেজে উঠছে প্রাণবন্ত গান, আর সেই সুরের তালে তালে নেচে উঠছে রঙিন পুতুলরা। ছোট্ট মঞ্চটিকে ঘিরে জড়ো হচ্ছেন শিশু থেকে শুরু করে প্রবীণ, সব বয়সের মানুষ। পুতুলের নাচ, সংলাপ আর গানের মিশেলে তারা শুনছে নানান গল্প। কখনো হাসির, কখনো শিক্ষার, কখনোবা সচেতনতার। বইমেলার এ আয়োজন পাঠের উৎসবের পাশাপাশি এক অনন্য সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতাও উপহার দিচ্ছে।
এ প্রাণবন্ত আয়োজনের পেছনে রয়েছে একদল তরুণ স্বপ্নবাজের গল্প। ২০১৯ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর উদ্যোগে যাত্রা শুরু করে ‘কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটার’। ‘বিন্দু দিয়ে আঁকি শিরদাঁড়া’ স্লোগান সামনে রেখে তারা পাপেট শিল্পকে বেছে নেয় সামাজিক সচেতনতার এক সৃজনশীল মাধ্যম হিসেবে। যদিও সূচনাটা ছিল অনেকটাই স্বতঃস্ফূর্ত ও আভিযাত্রিক। কয়েকটি পাপেট সঙ্গে নিয়ে দেশজুড়ে ঘুরে বেড়ানো, পথে পথে ছোট ছোট পাপেট শো করা, এ ছিল তাদের উদ্দেশ্য। সেই সহজ-সরল উদ্যোগই ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছে একটি সামাজিক পরিবর্তনে। আজ এ দলটি বিশেষ করে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
পাপেট থিয়েটার মূলত এমন এক শক্তিশালী শিল্প, যার মাধ্যমে জটিল সামাজিক বার্তাও সহজভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া যায়। ‘কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটার’-এর সংগ্রহে বর্তমানে প্রায় ৩০টি পাপেট চরিত্র রয়েছে, যেগুলো বিভিন্ন নাট্যপ্রযোজনায় মঞ্চস্থ করা হয়। এর মধ্যে কিছু সম্পূর্ণ মৌলিক চরিত্র, যেগুলো দলের সদস্যদের কল্পনা ও সৃজনশীলতা থেকে জন্ম নিয়েছে। আবার কিছু চরিত্র নেয়া হয়েছে পৌরাণিক কাহিনী ও ঐতিহাসিক গল্প থেকে, যাতে পুরনো আখ্যানগুলোকে নতুন করে মঞ্চে জীবন্ত করে তোলা যায়। পাশাপাশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাংলা পাঠ্যবইয়ের বিভিন্ন গল্প থেকেও তৈরি করা হয়েছে কয়েকটি চরিত্র। উদ্দেশ্য একটাই, মঞ্চে যখন সেই গল্পগুলো প্রাণ পায়, তখন শিশুরা সহজেই গল্পের আনন্দ ও অন্তর্নিহিত শিক্ষাটি উপলব্ধি করতে পারে।
বর্তমানে এ থিয়েটারে নিয়মিত কাজ করছেন ১০ থেকে ১৫ সদস্য। তাদের অধিকাংশই নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী। তবে জাহাঙ্গীরনগরের চারুকলা ও বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীরাও এ সৃজনশীল উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। একসময় গ্রামবাংলায় পাপেট শো ছিল জনপ্রিয় বিনোদনের মাধ্যম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঐতিহ্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে থিয়েটার বা পাপেট শোকে পেশা হিসেবে নেয়া কতটা বাস্তবসম্মত—এমন প্রশ্নের উত্তরে কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা আসাদুজ্জামান আশিক বলেন, ‘থিয়েটারকে পেশা হিসেবে নেয়াটা আমি ঝুঁকিপূর্ণ মনে করি না। আসলে ইচ্ছাশক্তি আর ধৈর্যটাই এখানে মূল বিষয়। তবে এটাও সত্য, সামাজিকভাবে অনেকেই এ পেশাটিকে ভিন্ন চোখে দেখে। যদি থিয়েটার কর্মীদের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা যায়, তবে এটি একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় পেশা হতে পারে। এর মাধ্যমে আমাদের বাংলার সংস্কৃতিও নতুন করে পুনরুজ্জীবিত হবে।’
দলের অর্থায়ন প্রসঙ্গে তিনি জানান, ‘এ থিয়েটারের সদস্যরাই প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা দেন। পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও ও সামাজিক সংগঠন সচেতনতামূলক কর্মসূচির জন্য তাদের আমন্ত্রণ জানায়, যেখান থেকে আর্থিক সহায়তাও পাওয়া যায়। আসলে টিমওয়ার্কটাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দলের সদস্যদের প্যাশনকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে অনেক কঠিন কাজও সহজ হয়ে যায়।’
কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহারকে উৎসাহিত করা। বৈশ্বিক পরিবেশ সংকটের এ সময়ে পরিবেশ রক্ষায় পুনর্ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি, এমন বিশ্বাস থেকেই তারা ফেলে দেয়া বিভিন্ন উপকরণকে পাপেট তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে তাদের শিল্পচর্চা কেবল বিনোদন বা সচেতনতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং পরিবেশবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গিরও এক সুন্দর উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
শুধু তা-ই নয়, দলটি ‘ক্যান্সার থেরাপি’ নামেও একটি বিশেষ সেশন পরিচালনা করে। সেখানে ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশুদের সামনে পাপেটের মজাদার উপস্থাপনার মাধ্যমে ওষুধ খাওয়ার গুরুত্ব, স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং নানা শিক্ষামূলক বার্তা সহজভাবে তুলে ধরা হয়। এছাড়া বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য তারা পাপেটের মাধ্যমে রঙ চেনানো, ভাষা শেখানো এবং মানসিক বিকাশে সহায়ক বিনোদনের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করে।
এভাবেই একদল তরুণের স্বপ্ন ও সৃজনশীল উদ্যোগ আজ পাপেট শিল্পকে নতুন করে প্রাণ দিচ্ছে। বইমেলার ভিড়ের মাঝে যখন ছোট্ট পুতুলরা গানের তালে তালে গল্প বলে, তখন মনে হয়, এ যেন কেবল বিনোদন নয়। বরং সংস্কৃতি, শিক্ষা ও মানবিকতার এক জীবন্ত মঞ্চ।