অধ্যাপক শাম্মী আক্তার সেতু। সভাপতি, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে বাড়ছে যানজট, জলাবদ্ধতা, আবাসন সংকট ও পরিবেশ দূষণ। এসব সমস্যা মোকাবেলায় নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনাবিদদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা (ইউআরপি) বিষয়ে পড়াশোনা, কর্মক্ষেত্র, প্রযুক্তির ব্যবহার ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাবি প্রতিনিধি
নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা (ইউআরপি) বিষয়টি আসলে কী?
নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা হলো কোনো এলাকার জনসংখ্যা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা এবং পরিবেশগত সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে সে এলাকার ভূমি ব্যবহার, অবকাঠামো ও নাগরিক সুবিধার পরিকল্পনা করা। একটি এলাকায় কতটুকু আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা প্রয়োজন, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে নগর পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি একটি মাল্টিডিসিপ্লিনারি সাবজেক্ট, যেটি এককভাবে কিছু নির্ধারণ করতে পারে না। কোনো এলাকার মানুষের চাহিদা ও জনসংখ্যার পাশাপাশি পরিবেশগতভাবে সেখানে কতটুকু উন্নয়ন সম্ভব, সেটি সূচারুভাবে বিশ্লেষণ করে পরিকল্পনা করা হয়।
দ্রুতবর্ধনশীল নগরায়ণের বাস্তবতায় এ বিষয়ে পড়াশোনার গুরুত্ব কতটা?
মানুষ উন্নত জীবনযাপন, কর্মসংস্থান ও নাগরিক সুবিধার জন্য শহরে আসছে। ফলে নগরায়ণের প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত হচ্ছে। কিন্তু এ প্রক্রিয়া পরিকল্পিত না হলে যানজট, গণপরিবহনের সংকট, উন্মুক্ত স্থান ও জনপরিসরের অভাব, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণের মতো নেতিবাচক বিষয় আমরা দেখতে পাই। আবাসন, পরিবহন ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে নগরায়ণকে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নিতে প্রশিক্ষিত পরিকল্পনাবিদ প্রয়োজন। নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনায় শিক্ষিত ব্যক্তিরা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
ইউআরপিতে কী কী বিষয় পড়ানো হয়?
শিক্ষার্থীদের ভূগোল, সমাজবিজ্ঞান, স্থাপত্য, প্রকৌশল, পরিবেশ, আবাসন, পরিবহন, জিআইএস, রিমোট সেন্সিং, ডেটাবেজ ব্যবস্থাপনা, পরিসংখ্যান, ইউটিলিটি ব্যবস্থাপনা ও ভূমি ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে পড়ানো হয়। তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা জরিপ পদ্ধতি, পরিসংখ্যান, ডেটাবেজ ব্যবস্থাপনা, জিআইএস ও রিমোট সেন্সিংয়ের ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করেন।
দেশের অপরিকল্পিত উন্নয়ন মোকাবেলায় ইউআরপি গ্র্যাজুয়েটরা কী ভূমিকা রাখছেন?
এসব সমস্যা প্রকট হওয়ার পেছনে পরিকল্পনাবিদদের যথাযথ জায়গায় না থাকা এবং পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘাটতি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বিষয়টি শুধু পরিকল্পনার অভাব নয়; অনেক ক্ষেত্রে পরিকল্পনা ও নীতিমালা থাকলেও সেগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে না। পরিকল্পনা তৈরি ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হলে সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক জায়গায় দায়িত্ব দিতে হবে।
শিক্ষার্থীরা আধুনিক প্রযুক্তিতে কতটা দক্ষ হচ্ছেন?
জিআইএস ও রিমোট সেন্সিং পরিকল্পনাসংক্রান্ত পড়াশোনার শুরু থেকেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পরিকল্পনা যত বেশি নির্ভরযোগ্য তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে করা যাবে, তত বেশি বাস্তবসম্মত হবে। কোনো এলাকার বর্তমান অবস্থা বিশ্লেষণ করে সেখানকার জন্য কী ধরনের পরিকল্পনা প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা হয়। এক্ষেত্রে ডেটা সায়েন্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পরিকল্পনায় এআই ও ডেটা সায়েন্সের ব্যবহার বাড়ানো গেলে সমস্যা বিশ্লেষণ এবং বাস্তবায়নযোগ্য সমাধান প্রস্তাব করা সহজ হবে। শিক্ষার্থীদের তাত্ত্বিক ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট ও টার্ম পেপারের মাধ্যমে এসব প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করানো হচ্ছে।
ইউআরপি গ্র্যাজুয়েটদের ক্যারিয়ার কোথায়?
আবাসন, গণপরিবহন, পরিবেশ, উন্নয়ন পরিকল্পনা ও ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থাপনা বা জিআইএস-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের কাজের সুযোগ রয়েছে। সরকারি খাতে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পরিকল্পনা-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং পৌরসভায় পরিকল্পনাবিদদের কাজের সুযোগ রয়েছে। বেসরকারি খাতে আবাসন ও রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান, পরিকল্পনাবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নকারী সংস্থায় কাজের সুযোগ রয়েছে। জেলা, উপজেলা ও পৌরসভা পর্যায়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরির কাজেও তারা যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ ও রিমোট সেন্সিং নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে সুযোগ রয়েছে।
ইউআরপি গ্র্যাজুয়েটদের বিদেশে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ কেমন?
শিক্ষার্থীরা নিজেদের আগ্রহ অনুযায়ী বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ খুঁজতে পারেন। এক্ষেত্রে স্নাতক পর্যায় থেকেই গবেষণার প্রতি মনোযোগী হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। থিসিসের সুযোগ থাকায় শিক্ষার্থীরা নিজেদের আগ্রহের বিষয় নির্বাচন করে গবেষণা করতে পারেন। আগ্রহের বিষয়টি শুরু থেকেই নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিলে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ কাজে লাগানো সহজ হয়।