বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা

কংক্রিটে মেডিকেল বর্জ্য মিশিয়ে শক্তিশালী বিম তৈরিতে সফল শাবিপ্রবি

পরিবেশে ছড়িয়ে থাকা যে প্লাস্টিক বর্জ্য মাটি ও পানিকে দূষিত করছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, সেই বর্জ্যই হতে পারে ভবিষ্যতের নির্মাণ শিল্পের শক্তিশালী উপকরণ।

এ অসম্ভব সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে কাজ করছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) একদল তরুণ গবেষক। পুনর্ব্যবহৃত পলিমার ব্যবহার করে তারা তৈরি করেছেন ফাইবার রিইনফোর্সড পলিমার বা এফআরপি প্রযুক্তিনির্ভর একটি উন্নত কংক্রিট বিম, যা এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মঞ্চে পৌঁছে গেছে।

গবেষণার কেন্দ্রে রয়েছে পলিপ্রোপিলিন পলিমার। স্যানিটারি ন্যাপকিন, সার্জিক্যাল মাস্ক ও ডায়াপারসহ চিকিৎসা ও স্যানিটারি বর্জ্যের একটি বড় অংশে থাকা এ উপাদানটি প্রাকৃতিকভাবে সম্পূর্ণ বিনষ্ট হতে প্রায় ৫০০-৭০০ বছর সময় নেয়। এ দীর্ঘমেয়াদি দূষণের চিত্র দেখেই শাবিপ্রবির গবেষক দলটি প্রশ্ন তোলেন—এ উপাদানকে কি নির্মাণ প্রযুক্তিতে পুনরায় কাজে লাগানো যায়? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই শুরু হয় তাদের গবেষণা।

প্রথমে বর্জ্য থেকে পলিপ্রোপিলিন সংগ্রহ করে কেমিক্যাল ও হট এয়ার ওভেনে জীবাণুমুক্ত করা হয়। এরপর পলিমারকে নির্দিষ্ট আকারে প্রক্রিয়াজাত করে কংক্রিটের মিশ্রণে যুক্ত করা হয়। সবশেষে স্টিল রেবারের বিকল্প হিসেবে গ্লাস ফাইবার ব্যবহার করে ল্যামিনেশন ও ইনফিউশন পদ্ধতিতে তৈরি হয় চূড়ান্ত এফআরপি বিম। পরীক্ষায় দেখা গেছে, এ বিমের লোড বহনক্ষমতা প্রচলিত কংক্রিট বিমের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

এ উদ্ভাবন কেবল প্রকৌশলগতভাবে শক্তিশালী নয়, সামাজিক ও পরিবেশগত দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে এটি পরিবেশে জমে থাকা বিপজ্জনক প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে ভবন, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে টেকসই ও সাশ্রয়ী সমাধানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।

এ যাত্রা একদিনে শুরু হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাধর্মী সংগঠন ‘ইকো জেনেসিস’-এর হাত ধরেই এ দলটির পথচলা শুরু। এর আগে সংগঠনটি চিকিৎসা বর্জ্য ও পলিপ্রোপিলিন ব্যবহার করে ‘ছায়া’ নামে একটি পরিবেশবান্ধব ছাদ উপকরণ তৈরি করে জাতীয় পর্যায়ে সাড়া ফেলেছিল। নিম্ন আয়ের পরিবার, বন্যাকবলিত অঞ্চল এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কথা মাথায় রেখে তৈরি এ টেকসই ও সাশ্রয়ী রুফিং শিট প্রচলিত টিনশিটের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারযোগ্য। আমেরিকান কংক্রিট ইনস্টিটিউট (এসিআই) চুয়েট স্টুডেন্ট চ্যাপ্টার আয়োজিত এসিআই কংক্রিট ফেস্টে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি তারা ইউনিভার্সিটি ইনোভেশন হাব প্রতিযোগিতায় প্রথম রানারআপ স্থানও অর্জন করে। সেই অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতাতেই জন্ম নেয় এফআরপি বিমের ধারণা।

আন্তর্জাতিক মঞ্চে এটি দলটির দ্বিতীয় অভিযান। এর আগে ২০২৫ সালের ২৯ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোরে আমেরিকান কংক্রিট ইনস্টিটিউট আয়োজিত এসিআই এগ প্রটেকশন ডিভাইস কম্পিটিশনে দক্ষিণ এশিয়া থেকে একমাত্র দল হিসেবে অংশ নিয়ে তারা বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে ১৭তম স্থান অর্জন করেছিলেন।

এবার আরো বড় মঞ্চের প্রস্তুতি চলছে। আমেরিকান কংক্রিট ইনস্টিটিউট (এসিআই) সাস্ট স্টুডেন্ট চ্যাপ্টার ও ইকো জেনেসিসের সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত নয় সদস্যের একটি দল গত গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে অনুষ্ঠিত এসিআই এফআরপি কম্পোজিটস কম্পিটিশনে বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পুর ও পরিবেশ কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মোশতাক আহমেদ ও অধ্যাপক ড. এইচএমএ মাহজুজের নেতৃত্বে এ দলে রয়েছেন ২০২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থী মিফতাহুল ইহসান দিহান ও তৌরাত হোসাইন, ২০২১-২২ সেশনের প্রাপ্তি সাহা এবং ২০২২-২৩ সেশনের ফারহানা ইসলাম প্রমা, নাদির-উজ-জামান নায়েফ, আতেফ ইবনে শহিদ, মো. মারুফ ও আবু ইয়াহিয়া।

শিক্ষার্থীরা জানান, বিভাগের শিক্ষক, সিনিয়র ও সহপাঠীদের সহযোগিতাই এ দীর্ঘ পথচলায় তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। তবে গবেষণা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থসংস্থান ও স্পন্সরশিপ পাওয়া এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। তারা আশা করছেন, সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিকে দেশের আবাসন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পূর্ণমাত্রায় কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পুর ও পরিবেশ কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মোশতাক আহমেদ বলেন, ‘আমাদের বিভাগের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরেই সময়োপযোগী গবেষণাগুলো করে যাচ্ছে, যা বর্তমানে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ শুরু করেছে। সবার সহযোগিতাই পারে বাংলাদেশকে গবেষণার দিক দিয়ে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে।’

টিম লিড নাদির-উজ-জামান নায়েফ বলেন, ‘আমাদের টিম ইকো জেনেসিস প্রায় দেড় বছর যাবত কাজ করে একটি পরিবেশবান্ধব টেকসই ছাদ বানাতে সক্ষম হয়। তার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ফাইবার রিইনফোর্সড বিম নিয়ে কাজ শুরু করি, যা নিয়ে টানা দুইবারের মতো আমরা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আমন্ত্রণ পাই। এখন আমাদের দরকার পর্যাপ্ত ফান্ডিং, যা দিয়েই কেবল আমরা আমাদের গবেষণাগুলো আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরতে পারব।’

আরও